জোছনা আর হারিকেন-কুপির আলোয় জমল হারানো পুঁথি পাঠের আসর
- আপডেট সময় : ০৫:৪৮:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে
আকাশে শরতের পূর্ণিমার চাঁদ। মায়াবী আলোয় আলোকিত গ্রামের নীরব উঠোন। উঠোন জুড়ে পাতা মাদুরে বসে আছেন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা। সামনে জলচৌকিতে বসেছেন পাঠক। পাশে জ্বলছে হারিকেন ও কুপি বাতি। চারপাশে নীরবতা। আলো-আঁধারির সেই আবহ ভেদ করে ভেসে আসছে পুঁথি পাঠের সুর।
কয়েক দশক আগে গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাওয়া এমন দৃশ্যের দেখা মিলল চলনবিলবিধৌত পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারপাড়া গ্রামে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে প্রয়াত কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠোনে বসেছিল গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্য পুঁথি পাঠের আসর। শহরের কোলাহল থেকে দূরে নিস্তব্ধ রাতে যেন ফিরে এসেছিল বাংলার মাটির পুরোনো এক ছবি। মনে হচ্ছিল, সময়টা হঠাৎ আশির দশকে ফিরে গেছে।
চাটমোহর উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে চলনবিলের পাড়ঘেঁষা নিভৃত পল্লী সোনাহারপাড়া। চাটমোহর জারদিস মোড় থেকে মান্নানগর পর্যন্ত ভাঙাচোরা ও ধুলোময় সড়ক পেরিয়ে ইট বিছানো পথে গ্রামে ঢুকতে হয়। সেই পথ মাড়িয়ে রাত সাড়ে আটটার দিকে আয়োজনস্থলে পৌঁছাতেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য।
বাড়ির উঠোনের এক পাশে খড়ের পালা, অন্য পাশে পুঁথি পাঠের আয়োজন। ভ্যাপসা গরমেও মানুষের আগ্রহে কমতি নেই। আয়োজকরা ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। মাথার ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ, আর উঠোনে কুপি ও হারিকেনের আলো— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম এক আবহ।
রাত সোয়া ৯টায় শুরু হয়ে সোয়া ১০টা পর্যন্ত চলে পুঁথি পাঠের আসর। শুরু হওয়ার আগেই মাদুরে বাড়তে থাকে দর্শকের সংখ্যা। একপর্যায়ে উঠোন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। শুধু চাটমোহর নয়, এ আয়োজন দেখতে ঢাকা থেকেও ছুটে আসেন কয়েকজন সংস্কৃতিপ্রেমী।
বিপ্লব আচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে পুঁথি পাঠের মুখবন্ধ পাঠ করেন আয়োজক ডা. আতিকুর রহমান আতিক। এরপর শুরু হয় মূল পাঠ। ‘বিবি সোনাভান’ পুঁথি পাঠ করেন নব্বইয়ের দশকের নাট্যজন ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান দুলাল। ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’ পাঠ করেন লইমুদ্দিন প্রামাণিক। পাঠ শেষে দুজনের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন আয়োজকরা।
গায়েনের কণ্ঠে পুঁথির মায়াবী সুরে মুগ্ধ হয়ে যান দর্শক-শ্রোতারা। জোছনা রাতে গল্প, সুর ও স্মৃতির এক আবেশ ছড়িয়ে পড়ে পুরো উঠোনে। ছোটবেলায় দাদা-দাদির মুখে শোনা গল্পের সেই পুঁথি পাঠের আসর চোখের সামনে দেখে আপ্লুত হন অনেকে। কারও কাছে এটি শৈশবে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি, আবার কারও কাছে হারিয়ে যাওয়া একটি সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। সব মিলিয়ে, যেন শেকড়ের সুরে ফিরে যাওয়া।
পুঁথি পাঠ শুনতে এসেছিলেন সত্তরোর্ধ্ব কৃষক হাসান প্রামাণিক। তিনি বলেন, “৪০ বছর আগে পুঁথি পাঠ শুনেছি। তখন মুরুব্বিরা এসব আয়োজন করতেন। কৃষিকাজ শেষে অবসরে আসরে বসে পুঁথি পাঠ শুনতাম। এত বছর পর আবার আয়োজন দেখে খুব ভালো লাগছে।”
ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ইমদাদুল হক। তার ভাষায়, “ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় নানা বাড়ির বৈঠকখানায় এ রকম পুঁথি পাঠের আসর বসত। এত বছর পর আবার পুঁথি পাঠ দেখে-শুনে মনে হলো, যেন সেই ছোটবেলায় ফিরে গেছি। এখন তো আমরা মোবাইলে ডুবে আছি। আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখা দরকার।”
তরুণ ফয়সাল মাহমুদ বলেন, “পুঁথি পাঠ আসলে কী, আগে জানতাম না। ফেসবুকে আয়োজনের প্রস্তুতির খবর দেখে ডা. আতিকুর রহমানকে ফোন করে জানতে পারি। আগে কখনো দেখিনি। তাই আব্বুর সঙ্গে দেখতে এসে খুব ভালো লাগছে।”
চাটমোহর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান টুকুন বলেন, “যখন সারা পৃথিবী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিতে ডুবে আছে, তখন এমন পুঁথি পাঠের আয়োজন সত্যিই বিরল। শত শত বছরের ঐতিহ্য আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি। পুঁথি পাঠ আমাদের আদি সংস্কৃতিরই অংশ। এটি ধরে রাখতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”
পুঁথি পাঠ করতে পেরে আবেগাপ্লুত নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় গ্রামে পুঁথি পাঠ শুনতাম। সেই সুরটা তখন থেকেই আমার মধ্যে ছিল। আমি পুঁথির পাঠক নই, তারপরও আজ প্রথমবার পাঠ করলাম। মনে হয়েছে, মানুষের মধ্যে একাত্মতাবোধ তৈরি করতে এবং মানুষকে কাছাকাছি আনতে পুঁথি পাঠের মতো হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলো ধরে রাখা জরুরি। সমসাময়িক গল্প নিয়ে নতুন পুঁথি রচনা করা গেলে মানুষকে সুন্দর পথের স্বপ্ন দেখানো সম্ভব।”
আয়োজক ডা. আতিকুর রহমান আতিক বলেন, “আমাদের ঐতিহ্যবাহী ও বর্ণিল সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে। পুঁথি পাঠ তার অন্যতম অংশ, যার শিকড় ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত। আশি-নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এটি নিভু নিভু করে টিকে ছিল। বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত এই সংস্কৃতি সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না। আমরা সেই সময়টায় ফিরে গিয়ে দেখতে চেয়েছি, কেমন ছিল পুঁথি পাঠের আসর। মূলত হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই এই আয়োজন।”
আয়োজনের খবর পেয়ে ঢাকা থেকে ছুটে এসেছিলেন পাঁচবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শব্দ প্রকৌশলী রিপন নাথ। তিনি বলেন, “খুবই ভালো একটি আয়োজন। নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে পুঁথি পাঠকে জনপ্রিয় করে মানুষের আরও কাছাকাছি নিতে হলে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নতুন গল্প তৈরি করতে হবে। এতে মানুষের আগ্রহ বাড়বে এবং ঐতিহ্যটি আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
একসময় যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, সার্কাস, পুঁথি পাঠ ও হাটুরে কবিতা ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময়ের সঙ্গে ভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাব, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও আধুনিকতার প্রবল ছোঁয়ায় এসব লোকজ ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত।
অথচ পূর্ণিমার চাঁদের নিচে কুপি-হারিকেনের আলোয় গতকালের পুঁথি পাঠের আসর মনে করিয়ে দিল, প্রযুক্তির দ্রুতগতির এই সময়েও শেকড়ের সঙ্গে মানুষের টান ফুরিয়ে যায়নি। প্রয়োজন শুধু সেই শেকড়ের সুরটিকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনা।



















