চীনের হামলা ঠেকাতে পেংঘু দ্বীপপুঞ্জে তাইওয়ানের জোর প্রস্তুতি
- আপডেট সময় : ১০:১৯:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে
চীনের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন (ফার্স্ট স্ট্রাইক) রুখে দিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘পেংঘু দ্বীপপুঞ্জে’ জোর সামরিক প্রস্তুতি শুরু করেছে তাইওয়ান। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং যদি তাইওয়ানের মূল ভূখণ্ডে হামলার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তাদের প্রথম লক্ষ্যবস্তুই হবে এই দ্বীপপুঞ্জ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সম্প্রতি পেংঘু দ্বীপপুঞ্জে ভোরের আলো ফোটার আগেই এক যুদ্ধ মহড়ার আয়োজন করে তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী। সবুজ প্লাস্টিক ক্যানিস্টার থেকে ১০৫ মিলিমিটারের গোলা বের করে ৪টি ট্যাংকে লোড করেন সেনাসদস্যরা। বেইজিংয়ের হামলা প্রতিহত করতে এই দ্বীপপুঞ্জে বর্তমানে হাজার হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছেন, যারা যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রথম সারির রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
মনোরম সৈকত ও প্রবালপ্রাচীরের জন্য পরিচিত ৯০টি দ্বীপের এই পেংঘু দ্বীপপুঞ্জটি তাইওয়ানের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পেংঘু দ্বীপপুঞ্জ তাইওয়ানের দখলে থাকলে চীনের মূল ভূখণ্ডমুখী হামলাকারী নৌবহরকে সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই নিজেদের জাহাজ ও যুদ্ধবিমান সুরক্ষিত রাখতে চীনকে শুরুতেই পেংঘু দখল অথবা এখানকার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে হবে।
তাইওয়ানের সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চ’-এর গবেষক সু জু-ইয়ুন জানান, চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) যদি পেংঘুকে পাশ কাটিয়ে মূল ভূখণ্ডে হামলার চেষ্টা করে, তবে পেংঘু থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তাদের জাহাজ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ফলে বাধ্য হয়েই চীনকে আগে পেংঘুতে আঘাত হানতে হবে।
তাইওয়ানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, পেংঘুতে ‘সিউং ফেং-৩’ এর মতো দূরপাল্লার অতি-সংবেদনশীল ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করায় চীনের জন্য উপকূলীয় এলাকায় সেনা সমাবেশ করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে প্রণালি পার হওয়ার আগেই চীনা সেনাসদস্য ও নৌবহরের ওপর আঘাত হানা সম্ভব হবে। পেংঘু হাতছাড়া হওয়া মানে পুরো তাইওয়ান প্রণালি কার্যত চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া।
তাইপেই সরকার ইতোমধ্যে পেংঘুর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারে বিপুল বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের সময় এখানকার ১ লাখ ১০ হাজার বাসিন্দার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হচ্ছে নানামুখী পদক্ষেপ। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান দখলের জন্য পিএলএকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন অবশ্য তাইওয়ানের এই প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে ‘হাস্যকর ও বিভ্রান্তিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ উসকে দিলে তাইপেই ‘সম্পূর্ণ ধ্বংসের’ মুখোমুখি হবে।
এদিকে গত বছর সাবেক মার্কিন, তাইওয়ানি ও জাপানি সামরিক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এক যুদ্ধ মহড়ায় (ওয়ার গেম) দেখা যায়—চীনের আকস্মিক হামলার মাত্র একদিনের মাথায় পেংঘুর পতন ঘটে। এই দ্রুত আত্মসমর্পণের ফলাফল বিবেচনা করেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করছেন বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
চীনের আগ্রাসন রুখতে সেনাসদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয়দের নাগরিক প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে যুদ্ধের সময় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ ও প্রতিরক্ষা বুথ তৈরিতে তারা ভূমিকা রাখতে পারেন।
ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজের গবেষক ইয়ান ইস্টন জানান, ঐতিহাসিকভাবেই এই দ্বীপপুঞ্জটি তাইওয়ান দখলের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। তার মতে, চীন পেংঘুতে হামলা চালাতে গেলে দেখতে পাবে এই দ্বীপগুলো দখল করা মোটেও সহজ নয়।



















