স্কুলছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, বিএনপি নেতাকে অব্যাহতি
- আপডেট সময় : ০৪:৫৯:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় এক স্কুলছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হওয়ার পর বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে বকুল মিয়াকে (৫০) দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
বিএনপি থেকে অব্যাহতি পাওয়া রফিকুল ইসলাম বিরুদ্ধে ওই স্কুলছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণ, ধর্ষণের ভিডিও ধারণ এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অন্যদের দিয়ে ধর্ষণ করানোর অভিযোগে মামলা হয়েছে।
গতকাল বুধবার দিবাগত রাতে কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সভাপতি খোকন আহমেদ ডিলার ও সাধারণ সম্পাদক মো. মোয়াজ্জেন হোসেন খানের সই করা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে রফিকুল ইসলামকে অব্যাহতির বিষয়টি জানানো হয়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মোয়াজ্জেন হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘বহিষ্কার করার ক্ষমতা আমাদের নেই, এটা জ্যেষ্ঠ নেতারা করতে পারেন। তাই আমরা তাকে অব্যাহতি দিয়েছি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকার কারণে রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বকুলকে কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদ এবং জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কেন্দুয়ায় দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক স্কুলছাত্রীকে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বকুলের নেতৃত্বে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। পরে ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে বিভিন্ন সময়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়। এমনকি ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে দীর্ঘদিন অন্য লোকজন দিয়েও তাকে ধর্ষণ করানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
একপর্যায়ে ওই স্কুলছাত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। পরে আবারও একই কাজে রাজি না হওয়ায় তার আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর স্কুলছাত্রী বিষয়টি তার পরিবারকে জানায়।
পরে গত মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে কেন্দুয়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। মামলায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার পরপরই ২ নম্বর আসামি আবু মিয়াকে (৩৬) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল বুধবার তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এদিকে মামলা হওয়ার পর থেকে প্রধান আসামি বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন।
মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীসহ তার পরিবারের ভাষ্যমতে, ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মামলার প্রধান আসামি বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম ভুক্তভোগীকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হয় এবং ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ধারণ করে রাখা হয়। তখন ওই ছাত্রী ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পরবর্তীতে ধারণ করা ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ওই ছাত্রীকে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। এতে কয়েকজন ব্যক্তি সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি পরিবারের কাছে প্রকাশ না করার জন্য ওই ছাত্রীকে হুমকি দেওয়া হতো।
এজাহারে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে রফিকুল ইসলামের সহযোগী এক নারী ওই ছাত্রীকে একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। সেখানে অন্য লোকদের দিয়ে তাকে ধর্ষণ করানো হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্তও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লোকজনকে দিয়ে তাকে ধর্ষণ করানো হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, গত ১ আগস্ট ওই ছাত্রী চট্টগ্রামে তার বড় ভাইয়ের কাছে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। পরে তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে পুরো ঘটনা জানায়।
গত ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা পরীক্ষা করানো হলে ওই ছাত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা যায়। ২৫ আগস্ট সে বাড়িতে ফিরে আসে। এরপর পরিবারের সদস্যরা ঘটনার বিস্তারিত জানার পর ২৬ আগস্ট কেন্দুয়া থানায় মামলা করেন।
রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে বকুল মিয়া ভুক্তভোগী ছাত্রীর খালু হন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রী বলেন, ‘আমাকে ভয় দেখিয়ে আমার খালু বকুল মিয়া ও আবু মিয়া বিভিন্ন বাসায় নিয়ে যেত। তখন আমি কিছু বুঝতাম না। তারা অন্য মানুষের দ্বারাও ধর্ষণ করাইছে। আমি যে বলে দিয়েছি, এই জন্য আমাকে মেরে ফেলতে পারে। আমি এইসবের কঠিন বিচার চাই।’
ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রীর বরাতে তার স্বজনরা জানান, এ কাজে দুইজন নারী ও একটি মেয়ে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ে যেত।
কেন্দুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম জানান, মামলা হওয়ার পরপরই অভিযান চালিয়ে ২ নম্বর আসামি মো. আবু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বুধবার বিকেলে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান ওসি।



















