ঢাকা ১০:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা পাচ্ছে এপিবিএন, আইনের খসড়া অনুমোদন মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন, একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ জিনপিংয়ের সৌদি বাদশাহ ও যুবরাজকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির ২০২৭ সালের এসএসসির রুটিন প্রকাশ সালমান শাহ হত্যা: অভিনেতা ডনকে ৭ দিনের রিমান্ডে চেয়েছে সিআইডি ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, বলটি বিক্রি হলো ৩৩ লাখ ডলারে দ্বৈত নাগরিকত্ব’ নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর পালটা প্রশ্ন— ‘কে নিউজ করছে? কার এত জ্বালা? প্রস্তুতি শেষ হলেই স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ‘ঝাঁপ দেবো’: সিইসি ৬ অক্টোবর ব্রাজিল-বাংলাদেশ প্রীতি ম্যাচ হতে পারে : বাফুফে সভাপতি রংপুরে একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যা: ২ আসামির স্বীকারোক্তি
সংবাদ শিরোনাম ::
ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা পাচ্ছে এপিবিএন, আইনের খসড়া অনুমোদন মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন, একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ জিনপিংয়ের সৌদি বাদশাহ ও যুবরাজকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির ২০২৭ সালের এসএসসির রুটিন প্রকাশ সালমান শাহ হত্যা: অভিনেতা ডনকে ৭ দিনের রিমান্ডে চেয়েছে সিআইডি ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, বলটি বিক্রি হলো ৩৩ লাখ ডলারে দ্বৈত নাগরিকত্ব’ নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর পালটা প্রশ্ন— ‘কে নিউজ করছে? কার এত জ্বালা? প্রস্তুতি শেষ হলেই স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ‘ঝাঁপ দেবো’: সিইসি ৬ অক্টোবর ব্রাজিল-বাংলাদেশ প্রীতি ম্যাচ হতে পারে : বাফুফে সভাপতি রংপুরে একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যা: ২ আসামির স্বীকারোক্তি

পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ: গোসম্পদ, দুধ উৎপাদন ও ডেইরি অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র

ড. মো. বায়েজিদ মোড়ল
  • আপডেট সময় : ০২:৩৯:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ ( গোসম্পদ, দুধ উৎপাদন ও ডেইরি অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র )।।বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সমপর্যায়ে—এমনকি তার চেয়েও এগিয়ে নিতে কী করা প্রয়োজন।।ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।

কৃষি সাংবাদিক, গবেষক ও সম্পাদক — AgricultureNews24.com।।

বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে গরু শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি কৃষকের সঞ্চয়, পরিবারের পুষ্টি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, দুধ ও মাংসের উৎস এবং কোটি মানুষের জীবিকার অংশ। গত এক দশকে বাংলাদেশ দুধ ও মাংস উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে একটি বড় ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বাংলাদেশে গরু আছে, খামারি আছে, বাজার আছে; কিন্তু প্রতি পশুর উৎপাদনশীলতা, মহিষসম্পদ, সংগঠিত দুধ সংগ্রহ, উন্নত জিনগত ব্যবস্থাপনা এবং বৃহৎ ডেইরি মূল্যশৃঙ্খলে আমরা এখনও পিছিয়ে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২৪–২৫ সালের হিসাবে দেশে গরু প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ ৭১ হাজারএবং মহিষ প্রায় ১৫ লাখ ৩২ হাজার। একই সময়ে মোট দুধ উৎপাদন ১৫৫.৩৮ লাখ মেট্রিক টন। জাতীয় চাহিদা ১৬২.৩৩ লাখ মেট্রিক টন হওয়ায় এখনও প্রায় ৬.৯৫ লাখ মেট্রিক টনের ঘাটতি রয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের ২০২৫–২৬ অর্থনৈতিক সমীক্ষার প্রাক্কলনে গরু প্রায় ৬ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার, মহিষ ৪ কোটি ৯১ লাখ এবং মোট দুধ উৎপাদন প্রায় ৭ কোটি ৪৬ লাখ ৮৯ হাজার টন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পাকিস্তানের এই ২০২৫–২৬ সংখ্যা এখনও পূর্ণাঙ্গ নতুন শুমারির চূড়ান্ত উৎপাদন ফল নয়; পুরোনো আন্তঃশুমারি বৃদ্ধির হারের ভিত্তিতে তৈরি প্রাক্কলন এবং নতুন শুমারির ফল পাওয়ার পর সংশোধিত হতে পারে।

এই গবেষণার মূল বক্তব্য তাই শুধু বাংলাদেশে গরুর সংখ্যা বাড়ানো নয়; একই সংখ্যক পশু থেকে বেশি দুধ, বেশি মাংস, বেশি বাছুর এবং বেশি কৃষক-আয় সৃষ্টি করা।

১. কেন পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা?

পাকিস্তানকে তুলনার দেশ হিসেবে বেছে নেওয়ার কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। দুই দেশই দক্ষিণ এশিয়ার, উষ্ণ আবহাওয়ার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং উভয় দেশেই গরু-মহিষ গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পাকিস্তানের সাহিওয়াল, রেড সিন্ধি এবং মহিষের নিলি-রাভি ও কুন্ডি জাত দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ জিনসম্পদ। বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা তাই ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার মডেলের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি বাস্তবসম্মত তুলনার ভিত্তি তৈরি করে।

২. গবেষণাটি যেভাবে করা হয়েছে

এই প্রতিবেদনে একটি বিষয় আমি সচেতনভাবে অনুসরণ করেছি—শুধু মোট পশুর সংখ্যা দিয়ে দুই দেশের সাফল্য বিচার করা হয়নি। গবেষণায় প্রধানত পাঁচটি স্তরের তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়েছে—

১. সরকারি প্রাণিসম্পদ ও কৃষি পরিসংখ্যান;
২. গরু ও মহিষের সংখ্যা;
৩. দুধ ও মাংস উৎপাদন;
৪. জাত, প্রজনন, খাদ্য ও খামার ব্যবস্থাপনা;
৫. খামারি থেকে সংগ্রহ, শীতলীকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের কাঠামো।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে Pakistan Bureau of Statistics (PBS)-এর Integrated Agricultural Census এবং Pakistan Economic Survey 2025–26 বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। পাকিস্তানের নতুন সমন্বিত কৃষিশুমারিতে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিযন্ত্রের তথ্য একই ব্যবস্থার মধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং দেশব্যাপী ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের Livestock Economy at a Glance 2024–2025, বিশ্বব্যাংকের গবেষণা ও প্রকল্প দলিল, FAO-র তথ্য এবং দেশের দুগ্ধ মূল্যশৃঙ্খলে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

৩. এক নজরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের গোসম্পদ পাকিস্তান বাংলাদেশগরু: প্রায় ৬.২০ কোটি*গরু: প্রায় ২.৫২ কোটিমহিষ: প্রায় ৪.৯১ কোটি*মহিষ: প্রায় ১৫.৩২ লাখগরু+মহিষ: প্রায় ১১.১১ কোটি*গরু+মহিষ: প্রায় ২.৬৭ কোটিমোট দুধ: প্রায় ৭.৪৭ কোটি টন*মোট দুধ: প্রায় ১.৫৫ কোটি টনগরুর দুধ: প্রায় ২.৮১ কোটি টন*সরকারি মোট দুধের হিসাবে গরু-মহিষসহ অন্যান্য উৎস একত্রে দেওয়া হয়েছেমহিষের দুধ: প্রায় ৪.৪৪ কোটি টন*মহিষের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে খুব ছোটডেইরিতে মহিষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণডেইরিতে গরুই প্রধানবড় জাতীয় দুধভিত্তিদ্রুত বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন ব্যবধান বড়শক্তিশালী দেশীয় দুগ্ধজাত জিনসম্পদদেশি জাত আছে, তবে উচ্চ উৎপাদনশীল জিনগত উন্নয়ন আরও প্রয়োজন

*পাকিস্তানের ২০২৫–২৬ সংখ্যাগুলো সরকারি প্রাক্কলন; পূর্ণাঙ্গ নতুন শুমারির উৎপাদন ফল প্রকাশের পর এগুলো সংশোধিত হতে পারে।

সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ব্যবধান

পাকিস্তানে গরুর সংখ্যা বাংলাদেশের প্রায় ২.৫ গুণ, কিন্তু গরু ও মহিষ একত্র করলে ব্যবধান প্রায় ৪ গুণেরও বেশি। আর মোট দুধ উৎপাদনে পাকিস্তান বাংলাদেশের প্রায় ৪.৮ গুণ এগিয়ে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে: দুই দেশের সরকারি দুধ উৎপাদনের হিসাবের পদ্ধতি পুরোপুরি এক নয়। ফলে মোট উৎপাদনের অনুপাতকে সরাসরি “প্রতি গরুর উৎপাদনশীলতার” অনুপাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

৪. সবচেয়ে বড় পার্থক্য—মহিষ

বাংলাদেশ-পাকিস্তান তুলনায় আমার গবেষণায় সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যবধানটি গরুর সংখ্যায় নয়, মহিষে।

 পাকিস্তান বাংলাদেশমহিষ প্রায় ৪.৯১ কোটিমহিষ প্রায় ১৫.৩২ লাখডেইরি অর্থনীতির কেন্দ্রীয় প্রাণীজাতীয় ডেইরি অর্থনীতিতে সীমিত ভূমিকামোট দুধের বড় অংশ মহিষ থেকেগরুর দুধের ওপর প্রধান নির্ভরতামহিষের উন্নত জাতের দীর্ঘ ইতিহাসসম্ভাবনা থাকলেও উন্নয়ন সীমিত

পাকিস্তানের সরকারি প্রাক্কলনে ২০২৫–২৬ সালে মহিষ থেকে প্রায় ৪ কোটি ৪৪ লাখ টন দুধ উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে—যা গরুর দুধের প্রাক্কলনের চেয়েও অনেক বেশি।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই নতুন চিন্তার জায়গা রয়েছে। দেশের চরাঞ্চল, হাওর, উপকূল ও জলাভূমির উপযোগী এলাকায় মহিষ উন্নয়নকে আলাদা জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।

৫. বাংলাদেশের অগ্রগতিও ছোট নয়

তুলনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের অর্জনকে ছোট করে দেখলে গবেষণাটি অসম্পূর্ণ হবে।

২০১৫–১৬ সালে বাংলাদেশে গরু ছিল প্রায় ২ কোটি ৩৭ লাখ ৮৫ হাজার। ২০২৪–২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ ৭১ হাজার হয়েছে। একই সময়ে সরকারি হিসাবে মোট দুধ উৎপাদন ৭২.৭৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ১৫৫.৩৮ লাখ মেট্রিক টনেপৌঁছেছে। অর্থাৎ এক দশকের কম সময়ে দুধ উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

আরও আশাব্যঞ্জক হলো—বাংলাদেশের মাংস উৎপাদন ২০২৪–২৫ সালে সরকারি হিসাবে চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। চাহিদা যেখানে ৭৭.৯২ লাখ মেট্রিক টন, উৎপাদন সেখানে ৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন। অতএব বাংলাদেশের গল্প শুধু পিছিয়ে থাকার নয়; বরং দ্রুত অগ্রসর হয়েও সম্ভাবনার তুলনায় কম উৎপাদনশীল থাকার গল্প।

৬. তাহলে বাংলাদেশ পিছিয়ে কেন?

আমার গবেষণায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার জন্য একটি কারণকে দায়ী করা সম্ভব হয়নি। এটি একটি সম্পূর্ণ উৎপাদনব্যবস্থার সমস্যা।

১. প্রতি পশুর উৎপাদন কম

বাংলাদেশের অনেক গাভীর দৈনিক দুধ উৎপাদন এখনও কম। পুরোনো হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বব্যাংক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র খামারি পর্যায়ে দুধ উৎপাদনশীলতার দুর্বলতার পেছনে নিম্নমানের জিনগত সক্ষমতা এবং মানসম্মত খাদ্যের ঘাটতিকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

২. পরিকল্পিত জাত উন্নয়ন এখনও যথেষ্ট নয়

দেশে কৃত্রিম প্রজনন সম্প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোন এলাকায় কোন জাত? কোন গাভীতে কোন বীজ? কী উদ্দেশ্যে—দুধ, মাংস, নাকি দ্বৈত উৎপাদন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জাতীয় পর্যায়ে অঞ্চলভিত্তিক breeding policy-তে আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

৩. খাদ্যই সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বাধা

উন্নত জিনের গাভী কিনে এনে যদি তাকে পর্যাপ্ত সবুজ ঘাস, খড়, সাইলেজ, শক্তি, আমিষ ও খনিজ দেওয়া না যায়, তাহলে জিনগত সম্ভাবনা কাজে আসে না।

বাংলাদেশে জমির চাপ বেশি। ফলে প্রতি একর জমি থেকে সর্বোচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন পশুখাদ্য উৎপাদন এখন জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

৪. খামারি দুধ উৎপাদন করেন—কিন্তু বাজার সব জায়গায় নিশ্চিত নয়

দুধ অত্যন্ত পচনশীল। উৎপাদনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সংগ্রহ ও শীতলীকরণ না হলে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন। ফলে শুধু গাভীর উৎপাদন বাড়ালে হবে না; একই সঙ্গে দরকার—খামার → সংগ্রহকেন্দ্র → শীতলীকরণ → পরিবহন → কারখানা → পণ্য → বাজার।

৫. রেকর্ড না রাখার সংস্কৃতি

একটি গাভীর মা কে? বাবা কে? জন্মতারিখ কত? প্রথম বাচ্চা দিয়েছে কত মাসে? দৈনিক দুধ কত? ৩০৫ দিনে কত দুধ? কতবার বীজ দেওয়ার পর গর্ভধারণ করেছে? হাজার হাজার খামারে এই মৌলিক তথ্যই নেই। যে প্রাণীর তথ্য নেই, তার বৈজ্ঞানিক জাত উন্নয়নও সম্ভব নয়।

৭. গবেষণার মাঝপথে আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি

পাকিস্তানের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করেছি, তাদের সাম্প্রতিক কৃষিশুমারি শুধু পশু গণনা করছে না। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও যান্ত্রিকীকরণকে একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থার মধ্যে আনার চেষ্টা হয়েছে। বড় পশুপালনকারী খামারকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে গণনার ব্যবস্থাও রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে একটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়—আমাদের শুধু “দেশে কত গরু আছে” জানলে চলবে না। জানতে হবে—কোন গরু কোথায় আছে, তার জাত কী, বয়স কত, উৎপাদন কত, প্রজনন ইতিহাস কী এবং বছরে সে কৃষককে কত টাকা আয় দিচ্ছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের পরবর্তী প্রাণিসম্পদ বিপ্লবের সূচনা হতে পারে তথ্য থেকে।

৮. বাংলাদেশের শক্তিশালী ভিত্তি ইতোমধ্যেই আছে

সবকিছু নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশে সফল মডেল রয়েছে।

Milk Vita থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশের সমবায়ভিত্তিক দুগ্ধ উন্নয়নে Milk Vita একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ। FAO-র Dairy Asia নথিতেও বাংলাদেশের ক্ষুদ্র দুগ্ধখামার এবং Milk Vita মডেলের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। এর শিক্ষা হলো—ছোট ছোট খামারিকে সংগঠিত করলে তারাই বড় দুগ্ধশিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারেন।

BRAC/Aarong Dairy থেকে শিক্ষা

BRAC-এর প্রকাশিত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, কৃষককে শুধু বাজার নয়—প্রজনন, ঘাসের বীজ, পশুচিকিৎসা এবং দুধ সংগ্রহ-শীতলীকরণের সঙ্গে যুক্ত করার সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। তাদের পুরোনো প্রতিবেদনে ১০১টি chilling station এবং প্রায় ৫০ হাজার খামারির সঙ্গে কাজ করার উদাহরণ পাওয়া যায়।

PRAN থেকে শিক্ষা

PRAN-এর নিজস্ব টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি দুধ সংগ্রহ এবং নিয়মিত অর্থ পরিশোধের মডেলের উদাহরণ রয়েছে।

এই তিনটি অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—বাংলাদেশে মডেল নেই—এ কথা সত্য নয়। সমস্যা হলো সফল মডেলগুলোকে জাতীয় মাত্রায় বিস্তৃত করা হয়নি।

৯. বিশ্বব্যাংকের LDDP থেকে কী শেখা যায়

বাংলাদেশের Livestock and Dairy Development Project (LDDP)-এ ইতোমধ্যে feed/fodder, Total Mixed Ration, milk collection hub, farm-level cooling, milking machine এবং dairy processing technology-র মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আমার মতে, এসব উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় গোসম্পদ রূপান্তর কর্মসূচির মধ্যে আনা প্রয়োজন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ: গোসম্পদ, দুধ উৎপাদন ও ডেইরি অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র

আপডেট সময় : ০২:৩৯:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ ( গোসম্পদ, দুধ উৎপাদন ও ডেইরি অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র )।।বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সমপর্যায়ে—এমনকি তার চেয়েও এগিয়ে নিতে কী করা প্রয়োজন।।ড. বায়েজিদ মোড়লের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন।

কৃষি সাংবাদিক, গবেষক ও সম্পাদক — AgricultureNews24.com।।

বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে গরু শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি কৃষকের সঞ্চয়, পরিবারের পুষ্টি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, দুধ ও মাংসের উৎস এবং কোটি মানুষের জীবিকার অংশ। গত এক দশকে বাংলাদেশ দুধ ও মাংস উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে একটি বড় ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বাংলাদেশে গরু আছে, খামারি আছে, বাজার আছে; কিন্তু প্রতি পশুর উৎপাদনশীলতা, মহিষসম্পদ, সংগঠিত দুধ সংগ্রহ, উন্নত জিনগত ব্যবস্থাপনা এবং বৃহৎ ডেইরি মূল্যশৃঙ্খলে আমরা এখনও পিছিয়ে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২৪–২৫ সালের হিসাবে দেশে গরু প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ ৭১ হাজারএবং মহিষ প্রায় ১৫ লাখ ৩২ হাজার। একই সময়ে মোট দুধ উৎপাদন ১৫৫.৩৮ লাখ মেট্রিক টন। জাতীয় চাহিদা ১৬২.৩৩ লাখ মেট্রিক টন হওয়ায় এখনও প্রায় ৬.৯৫ লাখ মেট্রিক টনের ঘাটতি রয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের ২০২৫–২৬ অর্থনৈতিক সমীক্ষার প্রাক্কলনে গরু প্রায় ৬ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার, মহিষ ৪ কোটি ৯১ লাখ এবং মোট দুধ উৎপাদন প্রায় ৭ কোটি ৪৬ লাখ ৮৯ হাজার টন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পাকিস্তানের এই ২০২৫–২৬ সংখ্যা এখনও পূর্ণাঙ্গ নতুন শুমারির চূড়ান্ত উৎপাদন ফল নয়; পুরোনো আন্তঃশুমারি বৃদ্ধির হারের ভিত্তিতে তৈরি প্রাক্কলন এবং নতুন শুমারির ফল পাওয়ার পর সংশোধিত হতে পারে।

এই গবেষণার মূল বক্তব্য তাই শুধু বাংলাদেশে গরুর সংখ্যা বাড়ানো নয়; একই সংখ্যক পশু থেকে বেশি দুধ, বেশি মাংস, বেশি বাছুর এবং বেশি কৃষক-আয় সৃষ্টি করা।

১. কেন পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা?

পাকিস্তানকে তুলনার দেশ হিসেবে বেছে নেওয়ার কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। দুই দেশই দক্ষিণ এশিয়ার, উষ্ণ আবহাওয়ার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং উভয় দেশেই গরু-মহিষ গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পাকিস্তানের সাহিওয়াল, রেড সিন্ধি এবং মহিষের নিলি-রাভি ও কুন্ডি জাত দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ জিনসম্পদ। বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা তাই ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার মডেলের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি বাস্তবসম্মত তুলনার ভিত্তি তৈরি করে।

২. গবেষণাটি যেভাবে করা হয়েছে

এই প্রতিবেদনে একটি বিষয় আমি সচেতনভাবে অনুসরণ করেছি—শুধু মোট পশুর সংখ্যা দিয়ে দুই দেশের সাফল্য বিচার করা হয়নি। গবেষণায় প্রধানত পাঁচটি স্তরের তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়েছে—

১. সরকারি প্রাণিসম্পদ ও কৃষি পরিসংখ্যান;
২. গরু ও মহিষের সংখ্যা;
৩. দুধ ও মাংস উৎপাদন;
৪. জাত, প্রজনন, খাদ্য ও খামার ব্যবস্থাপনা;
৫. খামারি থেকে সংগ্রহ, শীতলীকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের কাঠামো।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে Pakistan Bureau of Statistics (PBS)-এর Integrated Agricultural Census এবং Pakistan Economic Survey 2025–26 বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। পাকিস্তানের নতুন সমন্বিত কৃষিশুমারিতে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিযন্ত্রের তথ্য একই ব্যবস্থার মধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং দেশব্যাপী ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের Livestock Economy at a Glance 2024–2025, বিশ্বব্যাংকের গবেষণা ও প্রকল্প দলিল, FAO-র তথ্য এবং দেশের দুগ্ধ মূল্যশৃঙ্খলে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

৩. এক নজরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের গোসম্পদ পাকিস্তান বাংলাদেশগরু: প্রায় ৬.২০ কোটি*গরু: প্রায় ২.৫২ কোটিমহিষ: প্রায় ৪.৯১ কোটি*মহিষ: প্রায় ১৫.৩২ লাখগরু+মহিষ: প্রায় ১১.১১ কোটি*গরু+মহিষ: প্রায় ২.৬৭ কোটিমোট দুধ: প্রায় ৭.৪৭ কোটি টন*মোট দুধ: প্রায় ১.৫৫ কোটি টনগরুর দুধ: প্রায় ২.৮১ কোটি টন*সরকারি মোট দুধের হিসাবে গরু-মহিষসহ অন্যান্য উৎস একত্রে দেওয়া হয়েছেমহিষের দুধ: প্রায় ৪.৪৪ কোটি টন*মহিষের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে খুব ছোটডেইরিতে মহিষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণডেইরিতে গরুই প্রধানবড় জাতীয় দুধভিত্তিদ্রুত বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন ব্যবধান বড়শক্তিশালী দেশীয় দুগ্ধজাত জিনসম্পদদেশি জাত আছে, তবে উচ্চ উৎপাদনশীল জিনগত উন্নয়ন আরও প্রয়োজন

*পাকিস্তানের ২০২৫–২৬ সংখ্যাগুলো সরকারি প্রাক্কলন; পূর্ণাঙ্গ নতুন শুমারির উৎপাদন ফল প্রকাশের পর এগুলো সংশোধিত হতে পারে।

সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ব্যবধান

পাকিস্তানে গরুর সংখ্যা বাংলাদেশের প্রায় ২.৫ গুণ, কিন্তু গরু ও মহিষ একত্র করলে ব্যবধান প্রায় ৪ গুণেরও বেশি। আর মোট দুধ উৎপাদনে পাকিস্তান বাংলাদেশের প্রায় ৪.৮ গুণ এগিয়ে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে: দুই দেশের সরকারি দুধ উৎপাদনের হিসাবের পদ্ধতি পুরোপুরি এক নয়। ফলে মোট উৎপাদনের অনুপাতকে সরাসরি “প্রতি গরুর উৎপাদনশীলতার” অনুপাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

৪. সবচেয়ে বড় পার্থক্য—মহিষ

বাংলাদেশ-পাকিস্তান তুলনায় আমার গবেষণায় সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যবধানটি গরুর সংখ্যায় নয়, মহিষে।

 পাকিস্তান বাংলাদেশমহিষ প্রায় ৪.৯১ কোটিমহিষ প্রায় ১৫.৩২ লাখডেইরি অর্থনীতির কেন্দ্রীয় প্রাণীজাতীয় ডেইরি অর্থনীতিতে সীমিত ভূমিকামোট দুধের বড় অংশ মহিষ থেকেগরুর দুধের ওপর প্রধান নির্ভরতামহিষের উন্নত জাতের দীর্ঘ ইতিহাসসম্ভাবনা থাকলেও উন্নয়ন সীমিত

পাকিস্তানের সরকারি প্রাক্কলনে ২০২৫–২৬ সালে মহিষ থেকে প্রায় ৪ কোটি ৪৪ লাখ টন দুধ উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে—যা গরুর দুধের প্রাক্কলনের চেয়েও অনেক বেশি।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই নতুন চিন্তার জায়গা রয়েছে। দেশের চরাঞ্চল, হাওর, উপকূল ও জলাভূমির উপযোগী এলাকায় মহিষ উন্নয়নকে আলাদা জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।

৫. বাংলাদেশের অগ্রগতিও ছোট নয়

তুলনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের অর্জনকে ছোট করে দেখলে গবেষণাটি অসম্পূর্ণ হবে।

২০১৫–১৬ সালে বাংলাদেশে গরু ছিল প্রায় ২ কোটি ৩৭ লাখ ৮৫ হাজার। ২০২৪–২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ ৭১ হাজার হয়েছে। একই সময়ে সরকারি হিসাবে মোট দুধ উৎপাদন ৭২.৭৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ১৫৫.৩৮ লাখ মেট্রিক টনেপৌঁছেছে। অর্থাৎ এক দশকের কম সময়ে দুধ উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

আরও আশাব্যঞ্জক হলো—বাংলাদেশের মাংস উৎপাদন ২০২৪–২৫ সালে সরকারি হিসাবে চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। চাহিদা যেখানে ৭৭.৯২ লাখ মেট্রিক টন, উৎপাদন সেখানে ৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন। অতএব বাংলাদেশের গল্প শুধু পিছিয়ে থাকার নয়; বরং দ্রুত অগ্রসর হয়েও সম্ভাবনার তুলনায় কম উৎপাদনশীল থাকার গল্প।

৬. তাহলে বাংলাদেশ পিছিয়ে কেন?

আমার গবেষণায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার জন্য একটি কারণকে দায়ী করা সম্ভব হয়নি। এটি একটি সম্পূর্ণ উৎপাদনব্যবস্থার সমস্যা।

১. প্রতি পশুর উৎপাদন কম

বাংলাদেশের অনেক গাভীর দৈনিক দুধ উৎপাদন এখনও কম। পুরোনো হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বব্যাংক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র খামারি পর্যায়ে দুধ উৎপাদনশীলতার দুর্বলতার পেছনে নিম্নমানের জিনগত সক্ষমতা এবং মানসম্মত খাদ্যের ঘাটতিকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

২. পরিকল্পিত জাত উন্নয়ন এখনও যথেষ্ট নয়

দেশে কৃত্রিম প্রজনন সম্প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোন এলাকায় কোন জাত? কোন গাভীতে কোন বীজ? কী উদ্দেশ্যে—দুধ, মাংস, নাকি দ্বৈত উৎপাদন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জাতীয় পর্যায়ে অঞ্চলভিত্তিক breeding policy-তে আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

৩. খাদ্যই সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বাধা

উন্নত জিনের গাভী কিনে এনে যদি তাকে পর্যাপ্ত সবুজ ঘাস, খড়, সাইলেজ, শক্তি, আমিষ ও খনিজ দেওয়া না যায়, তাহলে জিনগত সম্ভাবনা কাজে আসে না।

বাংলাদেশে জমির চাপ বেশি। ফলে প্রতি একর জমি থেকে সর্বোচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন পশুখাদ্য উৎপাদন এখন জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

৪. খামারি দুধ উৎপাদন করেন—কিন্তু বাজার সব জায়গায় নিশ্চিত নয়

দুধ অত্যন্ত পচনশীল। উৎপাদনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সংগ্রহ ও শীতলীকরণ না হলে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন। ফলে শুধু গাভীর উৎপাদন বাড়ালে হবে না; একই সঙ্গে দরকার—খামার → সংগ্রহকেন্দ্র → শীতলীকরণ → পরিবহন → কারখানা → পণ্য → বাজার।

৫. রেকর্ড না রাখার সংস্কৃতি

একটি গাভীর মা কে? বাবা কে? জন্মতারিখ কত? প্রথম বাচ্চা দিয়েছে কত মাসে? দৈনিক দুধ কত? ৩০৫ দিনে কত দুধ? কতবার বীজ দেওয়ার পর গর্ভধারণ করেছে? হাজার হাজার খামারে এই মৌলিক তথ্যই নেই। যে প্রাণীর তথ্য নেই, তার বৈজ্ঞানিক জাত উন্নয়নও সম্ভব নয়।

৭. গবেষণার মাঝপথে আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি

পাকিস্তানের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করেছি, তাদের সাম্প্রতিক কৃষিশুমারি শুধু পশু গণনা করছে না। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও যান্ত্রিকীকরণকে একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থার মধ্যে আনার চেষ্টা হয়েছে। বড় পশুপালনকারী খামারকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে গণনার ব্যবস্থাও রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে একটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়—আমাদের শুধু “দেশে কত গরু আছে” জানলে চলবে না। জানতে হবে—কোন গরু কোথায় আছে, তার জাত কী, বয়স কত, উৎপাদন কত, প্রজনন ইতিহাস কী এবং বছরে সে কৃষককে কত টাকা আয় দিচ্ছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের পরবর্তী প্রাণিসম্পদ বিপ্লবের সূচনা হতে পারে তথ্য থেকে।

৮. বাংলাদেশের শক্তিশালী ভিত্তি ইতোমধ্যেই আছে

সবকিছু নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশে সফল মডেল রয়েছে।

Milk Vita থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশের সমবায়ভিত্তিক দুগ্ধ উন্নয়নে Milk Vita একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ। FAO-র Dairy Asia নথিতেও বাংলাদেশের ক্ষুদ্র দুগ্ধখামার এবং Milk Vita মডেলের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। এর শিক্ষা হলো—ছোট ছোট খামারিকে সংগঠিত করলে তারাই বড় দুগ্ধশিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারেন।

BRAC/Aarong Dairy থেকে শিক্ষা

BRAC-এর প্রকাশিত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, কৃষককে শুধু বাজার নয়—প্রজনন, ঘাসের বীজ, পশুচিকিৎসা এবং দুধ সংগ্রহ-শীতলীকরণের সঙ্গে যুক্ত করার সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। তাদের পুরোনো প্রতিবেদনে ১০১টি chilling station এবং প্রায় ৫০ হাজার খামারির সঙ্গে কাজ করার উদাহরণ পাওয়া যায়।

PRAN থেকে শিক্ষা

PRAN-এর নিজস্ব টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি দুধ সংগ্রহ এবং নিয়মিত অর্থ পরিশোধের মডেলের উদাহরণ রয়েছে।

এই তিনটি অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—বাংলাদেশে মডেল নেই—এ কথা সত্য নয়। সমস্যা হলো সফল মডেলগুলোকে জাতীয় মাত্রায় বিস্তৃত করা হয়নি।

৯. বিশ্বব্যাংকের LDDP থেকে কী শেখা যায়

বাংলাদেশের Livestock and Dairy Development Project (LDDP)-এ ইতোমধ্যে feed/fodder, Total Mixed Ration, milk collection hub, farm-level cooling, milking machine এবং dairy processing technology-র মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আমার মতে, এসব উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় গোসম্পদ রূপান্তর কর্মসূচির মধ্যে আনা প্রয়োজন।