জার্মান মাটিতে রুশ ‘হাইব্রিড হামলা’, কনস্যুলেট বন্ধের পথে বার্লিন
- আপডেট সময় : ০৭:৪৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
ইউক্রেন যুদ্ধের ছায়া এবার আরও গভীরভাবে ইউরোপের মাটিতে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। জার্মানির লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন দিয়ে চালানো ব্যর্থ হামলার জন্য সরাসরি রাশিয়াকে দায়ী করেছে জার্মানি। বার্লিনের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন নাশকতার ঘটনা নয়, বরং ইউরোপ জুড়ে রাশিয়ার চলমান ‘হাইব্রিড অপারেশনে’র অংশ।
মঙ্গলবার জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডব্রিন্ট বলেন, পুলিশি তদন্ত, হামলার ধরন ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সরকার এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ড্রোনটি নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিরা রুশ রাষ্ট্রীয় সংস্থার পক্ষে কাজ করছিলেন। ফলে ঘটনাটিকে জার্মান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রুশ হাইব্রিড হামলা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বার্তা সংস্থা এপি ও রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গত ৪ আগস্ট রাতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা এলাকায় একটি ড্রোন শনাক্ত করা হয়, যার সঙ্গে বিস্ফোরক ও ডেটোনেটর ছিল। সেটি একটি ইউক্রেনীয় কার্গো বিমানের কাছে পাওয়া যায় এবং পরে নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হয়। বিস্ফোরণ ঘটলে বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারত।
জার্মানিতে দক্ষ কর্মীর সংকট বাড়ছে
লাইপজিগ/হালে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্গো বিমানবন্দর। ইউক্রেনের জন্য সামরিক ও অন্যান্য সরঞ্জাম পরিবহনেও বিমানবন্দরটির গুরুত্ব রয়েছে। নিয়মিত সেখানে ইউক্রেনীয় আন্তোনভ পরিবহন বিমান ওঠানামা করে। ফলে জার্মান তদন্তকারীদের কাছে ড্রোনটির অবস্থান ও সম্ভাব্য লক্ষ্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’?
জার্মানি বলছে, এই হামলাকে একক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গত কয়েক বছরে সাইবার হামলা, নাশকতা, গুপ্তচরবৃত্তি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা এবং অন্যান্য অস্থিতিশীলতামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে।
ডব্রিন্টের ভাষায়, জার্মানি এখন আশঙ্কা করছে— দেশটি রাশিয়ার আরও ‘হাইব্রিড হামলা’র লক্ষ্য হতে পারে। জার্মান কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য সরাসরি যুদ্ধ শুরু করা নয়; বরং ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলা, ইউক্রেনকে সমর্থনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দুর্বল করা এবং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা।
এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলা হয়, যেখানে প্রচলিত সামরিক হামলার পরিবর্তে সাইবার আক্রমণ, নাশকতা, ড্রোন, গুপ্তচরবৃত্তি ও তথ্যযুদ্ধকে একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
কূটনৈতিক পালটা আঘাত বার্লিনের
রাশিয়াকে দায়ী করার পাশাপাশি কূটনৈতিক জবাবও দিয়েছে জার্মানি। রুশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন শহরে রাশিয়ার কনস্যুলেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বার্লিন। বার্লিনে রুশ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘রাশিয়ান হাউজে’র সঙ্গে চুক্তিও বাতিল করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে আরও রুশ নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও ভ্রমণ বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জার্মানি। রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিটে’র বিরুদ্ধেও চাপ বাড়াতে চায় বার্লিন।
জার্মানির এই পদক্ষেপে সমর্থন জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, রাশিয়ার দায়ের বিষয়ে ‘প্রমাণ স্পষ্ট’ এবং জার্মানির পদক্ষেপকে তিনি স্বাগত জানান। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েনও অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
মস্কোর অস্বীকার
তবে রাশিয়া অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। মস্কো জার্মানির পদক্ষেপকে ‘রুশবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়ে পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও জার্মানির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বার্লিনের বিরুদ্ধে প্রমাণ ‘সাজানো’র অভিযোগ তুলেছেন।
ফলে ঘটনাটি এখন শুধু একটি ব্যর্থ ড্রোন হামলার তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জার্মানি-রাশিয়া সম্পর্ককে আরও তলানিতে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের একটি নতুন মাত্রাও সামনে এনেছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর সরাসরি সংঘর্ষ না হলেও, ইউরোপের ভেতরে নাশকতা ও হাইব্রিড হামলার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। লাইপজিগের বিস্ফোরক ড্রোন সেই ধারারই সবচেয়ে গুরুতর উদাহরণগুলোর একটি।
যুদ্ধ যদি ইউক্রেনের সীমান্তের বাইরে না-ও যায়, তার ছায়া যে ইউরোপের ভেতরে ঢুকে পড়েছে— লাইপজিগের ঘটনাকে জার্মানি এখন সেই সতর্ক সংকেত হিসেবেই দেখছে।















