রংপুরে একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যা: ২ আসামির স্বীকারোক্তি
- আপডেট সময় : ০১:২৯:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি নেওয়ার পর তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আসামিরা হলেন মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। তারা নিহত পরিবারের বাড়ির আশপাশের এলাকার বাসিন্দা এবং পরস্পরের আত্মীয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, রোববার বিকেল ৫টার দিকে দুই আসামিকে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তাদের জবানবন্দি নেওয়া হয়। পরে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।
পরিদর্শক মিলন চ্যাটার্জি বলেন, “দুই আসামি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ফলে তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।”
এর আগে শনিবার রাতে কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, তাদের ২৩ বছর বয়সী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী।
পরদিন ভোরে একই এলাকার মুগ্ধ দাস ও তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। পরে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
সিদ্ধার্থ রংপুর নগরীর ‘পিকে জুয়েলার্স’ নামের একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করেন। মুগ্ধ সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানের কর্মী।
রোববার দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরেন।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, “বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাদের সেখানে অবস্থানের কারণ জানতে চান। এ সময় তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে আসামিরা।
“গণপতির চিৎকার শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। মায়ের চিৎকার শুনে এগিয়ে গেলে মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।”
তদন্ত কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জি বলেন, “মেয়েটিকে হত্যার সময় কয়েক মিনিট ধরে চেষ্টা করতে হয়েছে বলে আসামিরা জবানবন্দিতে জানিয়েছে। পরে ঘুমন্ত অবস্থায় ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীকেও কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।”
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর বাড়ির ভেতরেই গোসল করে আসামিরা। এরপর ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর ও শসা খায় এবং সেখানে আবার ইয়াবা সেবন করে।
পুলিশ জানায়, নিজেদের উপস্থিতির চিহ্ন মুছে ফেলতে নিহতদের দুটি স্মার্টফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। বাড়িতে থাকা স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করার জন্য আগুনও জ্বালানো হয়েছিল।
শনিবার রাতে পরিবারের কারও ফোন না ধরায় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান তার শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী ও তার স্বামী। বাড়িটি তখন অন্ধকার ছিল। ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তারা প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে ছাদে ওঠেন।
জানালার তালা ভেঙে ভেতরে তাকিয়ে পূজা ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান। একই সময় ঘরের ভেতর থেকে দুর্গন্ধও পান তিনি। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে ঘটনাস্থল থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বয়স ৬৫ বছর এবং তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বয়স ৫০ বছর। তাদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর বয়স ২৩ এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীর বয়স ১২ বছর।
রোববার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাতে দখিগঞ্জ শ্মশানে চারজনের দাহ সম্পন্ন হয়।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়। পরে স্বর্ণালংকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে লুকিয়ে রাখে আসামিরা।
আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেখান থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ কমিশনার বলেন, “নিজেদের আঙুলের ছাপ যেন না থাকে, সে জন্য নিহতদের দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল।”
এ ঘটনায় রোববার নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী কোতয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলায় নির্দিষ্ট কারও নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।
মামলা হওয়ার দিনই মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
হত্যার পর চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো অবস্থায় দেখা গেছে বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন। মুখের কাছাকাছি তরল পদার্থও পাওয়ার কথা জানান তারা। এ কারণে তাদের ওপর কোনো রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী বলেন, “মুখের কাছে তরল পদার্থ পাওয়া গেছে। এটি কোনো রাসায়নিক কি-না, ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
তবে ময়নাতদন্তকারী রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, “মরদেহ পচে যাওয়ার কারণেই মুখমণ্ডল এমন দেখাতে পারে। এসিডে ঝলসানোর কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস আগে গণপতি চক্রবর্তী প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ১৫ লাখ টাকা তুলেছিলেন বলে জানিয়েছেন রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ।
তার ভাষ্য, বাড়ির অসম্পূর্ণ নির্মাণকাজ শুরু করার জন্যই ওই টাকা তোলা হয়েছিল। তবে টাকা ব্যাংকে রাখা হয়েছিল নাকি বাড়িতে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
গণপতির বড় ভাই ও মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তীর কাছেও ওই অর্থের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।



















