ঢাকা ০৫:১০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
র‍্যাব বিলুপ্ত হয়ে গঠন হচ্ছে এসআরবি— মন্ত্রিসভায় অনুমোদন আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণে আরও সময় চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পে স্কেল নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন, বাস্তবায়ন এ বছরই: অর্থমন্ত্রী জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মর্যাদার ২৭৭ কর্মকর্তা একযোগে উপসচিব ৩লাখ রোহিঙ্গার পরিচয় শনাক্ত, রাখাইনে নিরাপত্তা ফিরলে প্রত্যাবাসন: মিয়ানমার মার্কিন সেনা আটক বা হত্যায় ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেবে ইরান মরুকরণ মোকাবিলায় প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল দ.কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশ ট্রাম্পের, কিমের সঙ্গে সম্পর্কের ঈঙ্গিত পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস নেতা ও ছেলেকে হত্যা: তদন্তে পুলিশ, গ্রেপ্তার ৩ নিবন্ধনের আওতায় আসছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, চার্জ দিতে হবে সৌরবিদ্যুতে
সংবাদ শিরোনাম ::
র‍্যাব বিলুপ্ত হয়ে গঠন হচ্ছে এসআরবি— মন্ত্রিসভায় অনুমোদন আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণে আরও সময় চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পে স্কেল নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন, বাস্তবায়ন এ বছরই: অর্থমন্ত্রী জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মর্যাদার ২৭৭ কর্মকর্তা একযোগে উপসচিব ৩লাখ রোহিঙ্গার পরিচয় শনাক্ত, রাখাইনে নিরাপত্তা ফিরলে প্রত্যাবাসন: মিয়ানমার মার্কিন সেনা আটক বা হত্যায় ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেবে ইরান মরুকরণ মোকাবিলায় প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল দ.কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশ ট্রাম্পের, কিমের সঙ্গে সম্পর্কের ঈঙ্গিত পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস নেতা ও ছেলেকে হত্যা: তদন্তে পুলিশ, গ্রেপ্তার ৩ নিবন্ধনের আওতায় আসছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, চার্জ দিতে হবে সৌরবিদ্যুতে

মরুকরণ মোকাবিলায় প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল

মো. আশরাফ আলী
  • আপডেট সময় : ০৩:১৮:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

উত্তর গোলার্ধ জুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, ভয়াবহ দাবানল, পানির সংকট ও ফসলহানির মধ্যে মরুকরণ ও ভূমির অবক্ষয় মোকাবিলায় জাতিসংঘের এবারের সম্মেলন নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তখন মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনা, খরা মোকাবিলা এবং অবক্ষয় হওয়া ভূমি পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের অর্থায়ন কীভাবে করা হবে, সেটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরে সোমবার (১৭ আগস্ট) শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের (ইউএনসিসিডি) ১৭তম সম্মেলন— কপ১৭। ২৮ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এই বৈঠক। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে উন্নয়নশীল ও খরাপ্রবণ দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ কীভাবে বাস্তব প্রকল্পে ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা করবেন।

জাতিসংঘের মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের নির্বাহী সচিব ইয়াসমিন ফুয়াদ বলেছেন, এবারের আলোচনা বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রতি একটি ‘ইতিবাচক সংকেত’ পাঠ করবে।

১২ বিলিয়ন ডলার বাস্তব কাজে রূপ দেওয়ার চেষ্টা

কপ১৭-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো দুই বছর আগে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যে বিপুল অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবে কাজে লাগানো। অর্থাৎ শুধু তহবিল ঘোষণা নয়, খরা ও ভূমির অবক্ষয়ে আক্রান্ত দেশগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

২০২৪ সালে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত কপ১৬-তে গড়ে ওঠে ‘রিয়াদ গ্লোবাল ড্রট রেজিলিয়েন্স পার্টনারশিপ’। সৌদি আরবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগের আওতায় এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন তহবিলে ৭৪টি খরাপীড়িত দেশের জন্য সাত বছরে ১২ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

ফুয়াদ বলেন, ৭০টির বেশি দেশ এরই মধ্যে খরা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। এখন সেই পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করাই বড় কাজ।

এসব প্রকল্পের মধ্যে থাকতে পারে কৃষিতে সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পানির অপচয় কমানো, খরা সহনশীল ফসলের চাষ বাড়ানো এবং কৃষকদের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের অবকাঠামো উন্নত করা।

অর্থাৎ, সম্মেলনের লক্ষ্য শুধু মরুকরণ ঠেকানো নয়; বরং কৃষি উৎপাদন, পানি নিরাপত্তা ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে তোলা।

তীব্র গরম ও খরা বাড়াচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি

এবারের সম্মেলন এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন উত্তর গোলার্ধের বিস্তীর্ণ অঞ্চল রেকর্ড তাপমাত্রার মুখোমুখি। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এশিয়ার কোটি কোটি মানুষ ভুগছে তীব্র তাপপ্রবাহে। কোথাও বৃষ্টির অভাবে কৃষিজমি শুকিয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ফসল নষ্ট হচ্ছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্যের দামে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফসলের ক্ষতি হলে খাদ্য সরবরাহ কমে গিয়ে মূল্য বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে পানি সংকট কৃষকদের উৎপাদনক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, বর্তমানে তৈরি হওয়া শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’ আবহাওয়াব্যবস্থার কারণে আরও ৫ কোটি মানুষ ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এ বাস্তবতায় ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা মোকাবিলাকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা, দারিদ্র্য, অভিবাসন এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতাও সরাসরি যুক্ত।

ফুয়াদের ভাষায়, আলোচনার কেন্দ্রেই রয়েছে খাদ্যনিরাপত্তা। ভূমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে মাটির উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো গেলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ভিত্তিও শক্তিশালী হয়। ফলে পরিবেশগত অর্থায়নের আলোচনায় এই বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিন দশক ধরে ‘অবহেলিত’ পরিবেশ চুক্তি

মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের গুরুত্ব নতুন নয়। ১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনের পর গড়ে ওঠা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পরিবেশ চুক্তির একটি হলো ইউএনসিসিডি। অন্য দুটি হলো— জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশন।

ইউএনএফসিসিসির অধীনেই ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি গৃহীত হয়। আর জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের আওতায় প্রজাতি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে গত তিন দশকে এই তিন চুক্তির মধ্যে মরুকরণবিরোধী চুক্তিটিই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম মনোযোগ পেয়েছে। অর্থায়ন ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের দিক থেকেও এটি পিছিয়ে ছিল। ফলে ভূমির অবক্ষয়, মরুকরণ এবং খরা মোকাবিলায় অগ্রগতি হয়েছে সীমিত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা ও ভূমির অবক্ষয় যখন কৃষি, পানি ও খাদ্যব্যবস্থার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠছে, তখন বিষয়টি বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের কাছেও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ সৌদি আরব। তেলনির্ভর এই দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তর্জাতিক আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমানো এবং জলবায়ু অর্থায়নের বিভিন্ন আহ্বানের ক্ষেত্রেও দেশটির অবস্থান প্রায়ই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

কিন্তু মরুকরণবিরোধী উদ্যোগে সৌদি আরব এখন বড় সমর্থক। ২০২৪ সালে রিয়াদে কপ১৬ আয়োজনের পর দেশটি ইউএনসিসিডির লক্ষ্য বাস্তবায়নে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে মিত্র দেশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বড় আকারের যৌথ অর্থায়নের উদ্যোগেও যুক্ত হয়েছে।

সৌদি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ওসামা ফাকিহা বলেন, ভূমির অবক্ষয় ও খরা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সামগ্রিক কল্যাণে বড় প্রভাব ফেলছে।

তার মতে, রিয়াদে অনুষ্ঠিত কপ১৬ বৈশ্বিকভাবে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও খরা মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার পাশাপাশি ইউএনএফসিসিসি থেকেও সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও দেশটি এখনো ইউএনসিসিডির সদস্য।

ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বৈশ্বিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অবস্থান যতটা কঠোর বা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে, মরুকরণ ও ভূমি পুনরুদ্ধারের এই আলোচনায় তার অবস্থান ততটা বিচ্ছিন্ন নয়।

এতে কপ১৭-এর আলোচনায় পরিবেশগত প্রয়োজনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রয়োজন ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার

তবে ১২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি যত বড়ই মনে হোক, প্রয়োজনের তুলনায় তা অত্যন্ত কম।

ইউএনসিসিডির হিসাব অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ নাগাদ অবক্ষয় হওয়া ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ ঠেকানো, খরার বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরি এবং মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।

সেই তুলনায় ১২ বিলিয়ন ডলার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তবু সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কারণ এতদিন মরুকরণ ও ভূমি পুনরুদ্ধার বৈশ্বিক পরিবেশগত অর্থায়নে তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত ছিল। এখন অন্তত একটি নির্দিষ্ট তহবিল ও প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নের কাঠামো তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মূল প্রশ্ন হলো— প্রতিশ্রুত অর্থ কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ের প্রকল্পে পৌঁছানো যায়।

শুধু সরকারি অর্থে চলবে না

এখন পর্যন্ত প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থই এসেছে সরকারি খাত থেকে। কিন্তু ইউএনসিসিডি বলছে, প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থ অনেক কম হওয়ায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা জরুরি।

বিশেষ করে যেসব কোম্পানি পানি, কৃষিজমি ও ফসলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি থেকে শুরু করে বস্ত্রশিল্প— অনেক বড় শিল্পই বিপুল পরিমাণ পানি ও কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল।

ফুয়াদের মতে, এসব ব্যবসার জন্যও ভূমির অবক্ষয় ও পানির সংকট বড় ঝুঁকি। তাই ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা মোকাবিলায় তাদের অর্থায়ন ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা কমনল্যান্ডের অ্যাডভোকেসি প্রধান লিলি ম্যাক্সওয়েল-লুইনও ধনী দেশগুলোর কাছে আরও বড় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

তার মতে, দরিদ্র দেশগুলোতে খরা মোকাবিলা ও ভূমি পুনরুদ্ধারে অর্থায়ন করলে শুধু ওই দেশগুলোই লাভবান হবে না। এর সুফল পৌঁছাবে ধনী দেশগুলোর কাছেও। কারণ অন্য দেশে কৃষিজমি নষ্ট হওয়া শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা, অভিবাসনের চাপ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে।

কপ১৭-এর সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই। এতদিন বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশের আলোচনার কেন্দ্র ছিল কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল— ভূমির অবক্ষয় ও খরা তুলনামূলকভাবে কম অর্থ পেয়েছে। এখন সেই চিত্র বদলানোর চেষ্টা চলছে।

বিশ্বের একদিকে যখন তাপমাত্রা বাড়ছে, অন্যদিকে পানির সংকট ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষিকে অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে মাটির স্বাস্থ্য, পানি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষির সহনশীলতা বাড়ানোকে জলবায়ু মোকাবিলার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

কপ১৭-এ যদি ৭০টির বেশি দেশের খরা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়া যায় এবং প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলার কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তবে এটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ অর্থায়নে একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

তবে শুধু অর্থ ঘোষণা করলেই হবে না। অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ মরুকরণ ও ভূমির অবক্ষয় এক দিনে তৈরি হয় না, আর একবার অর্থ বরাদ্দ করলেই তা দ্রুত সমাধানও করা যায় না। এর সঙ্গে কৃষি, পানি, খাদ্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রা জড়িয়ে আছে। তাই কপ১৭-এর সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো— ১২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতিকে এমন কার্যকর উদ্যোগে পরিণত করা, যা আগামী বছরগুলোতে কোটি কোটি মানুষের খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত, মাটিকে রক্ষা করার এই লড়াই শুধু মরুভূমির বিস্তার ঠেকানোর লড়াই নয়; এটি বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লড়াই।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

মরুকরণ মোকাবিলায় প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল

আপডেট সময় : ০৩:১৮:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

উত্তর গোলার্ধ জুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, ভয়াবহ দাবানল, পানির সংকট ও ফসলহানির মধ্যে মরুকরণ ও ভূমির অবক্ষয় মোকাবিলায় জাতিসংঘের এবারের সম্মেলন নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তখন মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনা, খরা মোকাবিলা এবং অবক্ষয় হওয়া ভূমি পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের অর্থায়ন কীভাবে করা হবে, সেটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরে সোমবার (১৭ আগস্ট) শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের (ইউএনসিসিডি) ১৭তম সম্মেলন— কপ১৭। ২৮ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এই বৈঠক। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে উন্নয়নশীল ও খরাপ্রবণ দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ কীভাবে বাস্তব প্রকল্পে ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা করবেন।

জাতিসংঘের মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের নির্বাহী সচিব ইয়াসমিন ফুয়াদ বলেছেন, এবারের আলোচনা বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রতি একটি ‘ইতিবাচক সংকেত’ পাঠ করবে।

১২ বিলিয়ন ডলার বাস্তব কাজে রূপ দেওয়ার চেষ্টা

কপ১৭-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো দুই বছর আগে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যে বিপুল অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবে কাজে লাগানো। অর্থাৎ শুধু তহবিল ঘোষণা নয়, খরা ও ভূমির অবক্ষয়ে আক্রান্ত দেশগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

২০২৪ সালে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত কপ১৬-তে গড়ে ওঠে ‘রিয়াদ গ্লোবাল ড্রট রেজিলিয়েন্স পার্টনারশিপ’। সৌদি আরবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগের আওতায় এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন তহবিলে ৭৪টি খরাপীড়িত দেশের জন্য সাত বছরে ১২ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

ফুয়াদ বলেন, ৭০টির বেশি দেশ এরই মধ্যে খরা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। এখন সেই পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করাই বড় কাজ।

এসব প্রকল্পের মধ্যে থাকতে পারে কৃষিতে সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পানির অপচয় কমানো, খরা সহনশীল ফসলের চাষ বাড়ানো এবং কৃষকদের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের অবকাঠামো উন্নত করা।

অর্থাৎ, সম্মেলনের লক্ষ্য শুধু মরুকরণ ঠেকানো নয়; বরং কৃষি উৎপাদন, পানি নিরাপত্তা ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে তোলা।

তীব্র গরম ও খরা বাড়াচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি

এবারের সম্মেলন এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন উত্তর গোলার্ধের বিস্তীর্ণ অঞ্চল রেকর্ড তাপমাত্রার মুখোমুখি। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এশিয়ার কোটি কোটি মানুষ ভুগছে তীব্র তাপপ্রবাহে। কোথাও বৃষ্টির অভাবে কৃষিজমি শুকিয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ফসল নষ্ট হচ্ছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্যের দামে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফসলের ক্ষতি হলে খাদ্য সরবরাহ কমে গিয়ে মূল্য বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে পানি সংকট কৃষকদের উৎপাদনক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, বর্তমানে তৈরি হওয়া শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’ আবহাওয়াব্যবস্থার কারণে আরও ৫ কোটি মানুষ ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এ বাস্তবতায় ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা মোকাবিলাকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা, দারিদ্র্য, অভিবাসন এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতাও সরাসরি যুক্ত।

ফুয়াদের ভাষায়, আলোচনার কেন্দ্রেই রয়েছে খাদ্যনিরাপত্তা। ভূমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে মাটির উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো গেলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ভিত্তিও শক্তিশালী হয়। ফলে পরিবেশগত অর্থায়নের আলোচনায় এই বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিন দশক ধরে ‘অবহেলিত’ পরিবেশ চুক্তি

মরুকরণবিরোধী কনভেনশনের গুরুত্ব নতুন নয়। ১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনের পর গড়ে ওঠা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পরিবেশ চুক্তির একটি হলো ইউএনসিসিডি। অন্য দুটি হলো— জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশন।

ইউএনএফসিসিসির অধীনেই ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি গৃহীত হয়। আর জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের আওতায় প্রজাতি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে গত তিন দশকে এই তিন চুক্তির মধ্যে মরুকরণবিরোধী চুক্তিটিই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম মনোযোগ পেয়েছে। অর্থায়ন ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের দিক থেকেও এটি পিছিয়ে ছিল। ফলে ভূমির অবক্ষয়, মরুকরণ এবং খরা মোকাবিলায় অগ্রগতি হয়েছে সীমিত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা ও ভূমির অবক্ষয় যখন কৃষি, পানি ও খাদ্যব্যবস্থার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠছে, তখন বিষয়টি বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের কাছেও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ সৌদি আরব। তেলনির্ভর এই দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তর্জাতিক আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমানো এবং জলবায়ু অর্থায়নের বিভিন্ন আহ্বানের ক্ষেত্রেও দেশটির অবস্থান প্রায়ই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

কিন্তু মরুকরণবিরোধী উদ্যোগে সৌদি আরব এখন বড় সমর্থক। ২০২৪ সালে রিয়াদে কপ১৬ আয়োজনের পর দেশটি ইউএনসিসিডির লক্ষ্য বাস্তবায়নে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে মিত্র দেশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বড় আকারের যৌথ অর্থায়নের উদ্যোগেও যুক্ত হয়েছে।

সৌদি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ওসামা ফাকিহা বলেন, ভূমির অবক্ষয় ও খরা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সামগ্রিক কল্যাণে বড় প্রভাব ফেলছে।

তার মতে, রিয়াদে অনুষ্ঠিত কপ১৬ বৈশ্বিকভাবে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও খরা মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার পাশাপাশি ইউএনএফসিসিসি থেকেও সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও দেশটি এখনো ইউএনসিসিডির সদস্য।

ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বৈশ্বিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অবস্থান যতটা কঠোর বা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে, মরুকরণ ও ভূমি পুনরুদ্ধারের এই আলোচনায় তার অবস্থান ততটা বিচ্ছিন্ন নয়।

এতে কপ১৭-এর আলোচনায় পরিবেশগত প্রয়োজনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রয়োজন ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার

তবে ১২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি যত বড়ই মনে হোক, প্রয়োজনের তুলনায় তা অত্যন্ত কম।

ইউএনসিসিডির হিসাব অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ নাগাদ অবক্ষয় হওয়া ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ ঠেকানো, খরার বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরি এবং মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।

সেই তুলনায় ১২ বিলিয়ন ডলার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তবু সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কারণ এতদিন মরুকরণ ও ভূমি পুনরুদ্ধার বৈশ্বিক পরিবেশগত অর্থায়নে তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত ছিল। এখন অন্তত একটি নির্দিষ্ট তহবিল ও প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নের কাঠামো তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মূল প্রশ্ন হলো— প্রতিশ্রুত অর্থ কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ের প্রকল্পে পৌঁছানো যায়।

শুধু সরকারি অর্থে চলবে না

এখন পর্যন্ত প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থই এসেছে সরকারি খাত থেকে। কিন্তু ইউএনসিসিডি বলছে, প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থ অনেক কম হওয়ায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা জরুরি।

বিশেষ করে যেসব কোম্পানি পানি, কৃষিজমি ও ফসলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি থেকে শুরু করে বস্ত্রশিল্প— অনেক বড় শিল্পই বিপুল পরিমাণ পানি ও কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল।

ফুয়াদের মতে, এসব ব্যবসার জন্যও ভূমির অবক্ষয় ও পানির সংকট বড় ঝুঁকি। তাই ভূমি পুনরুদ্ধার ও খরা মোকাবিলায় তাদের অর্থায়ন ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা কমনল্যান্ডের অ্যাডভোকেসি প্রধান লিলি ম্যাক্সওয়েল-লুইনও ধনী দেশগুলোর কাছে আরও বড় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

তার মতে, দরিদ্র দেশগুলোতে খরা মোকাবিলা ও ভূমি পুনরুদ্ধারে অর্থায়ন করলে শুধু ওই দেশগুলোই লাভবান হবে না। এর সুফল পৌঁছাবে ধনী দেশগুলোর কাছেও। কারণ অন্য দেশে কৃষিজমি নষ্ট হওয়া শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা, অভিবাসনের চাপ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে।

কপ১৭-এর সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই। এতদিন বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশের আলোচনার কেন্দ্র ছিল কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল— ভূমির অবক্ষয় ও খরা তুলনামূলকভাবে কম অর্থ পেয়েছে। এখন সেই চিত্র বদলানোর চেষ্টা চলছে।

বিশ্বের একদিকে যখন তাপমাত্রা বাড়ছে, অন্যদিকে পানির সংকট ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষিকে অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে মাটির স্বাস্থ্য, পানি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষির সহনশীলতা বাড়ানোকে জলবায়ু মোকাবিলার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

কপ১৭-এ যদি ৭০টির বেশি দেশের খরা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়া যায় এবং প্রতিশ্রুত ১২ বিলিয়ন ডলার কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তবে এটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ অর্থায়নে একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

তবে শুধু অর্থ ঘোষণা করলেই হবে না। অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ মরুকরণ ও ভূমির অবক্ষয় এক দিনে তৈরি হয় না, আর একবার অর্থ বরাদ্দ করলেই তা দ্রুত সমাধানও করা যায় না। এর সঙ্গে কৃষি, পানি, খাদ্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রা জড়িয়ে আছে। তাই কপ১৭-এর সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো— ১২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতিকে এমন কার্যকর উদ্যোগে পরিণত করা, যা আগামী বছরগুলোতে কোটি কোটি মানুষের খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত, মাটিকে রক্ষা করার এই লড়াই শুধু মরুভূমির বিস্তার ঠেকানোর লড়াই নয়; এটি বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লড়াই।