ন্যাটোতে বুলেটসহ রিভলভার উপহার এরদোয়ানের!
- আপডেট সময় : ০৪:৫৬:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে স্মারক, শিল্পকর্ম বা সাংস্কৃতিক উপহার বিনিময়ের রেওয়াজ পুরনো। কিন্তু এবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত সম্মেলন শেষে অতিথি নেতাদের হাতে উপহার তুলে দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। কূটনৈতিক মহলে তার এ উপহার বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে এরদোয়ান উপহার হিসেবে প্রত্যেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে দেন একটি ম্যাগনাম রিভলভার। এখানেই শেষ নয়, প্রতিটি রিভলভারে উপহারগ্রহীতার নাম খোদাই করা রয়েছে। প্রতিটি রিভলভারের সঙ্গে ছয়টি তাজা গুলিও দেওয়া হয়!
এই ‘অস্বাভাবিক’ উপহার পাওয়ার পর বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা ও প্রোটোকল কর্মকর্তাদের মধ্যে শুরু হয় ব্যাপক তৎপরতা। কারণ, কার্যকর আগ্নেয়াস্ত্র ও জীবন্ত গুলি নিয়ে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, নিরাপত্তা বিধি ও আইনি জটিলতা সামলানো মোটেও সহজ ছিল না।
আঙ্কারায় শুরু ন্যাটো সম্মেলন: কারা অংশ নিচ্ছেন, কী থাকছে আলোচনায়?
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারই প্রথম প্রকাশ্যে এ উপহারের কথা জানান। আঙ্কারা থেকে দেশে ফেরার বিমানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতাদের প্রত্যেকেই নিজের নাম খোদাই করা একটি রিভলভার পেয়েছেন। রিভলভারটি রাখা ছিল কালো আস্তরণযুক্ত লাল রঙের একটি বাক্সে। তার পাশেই ছিল ছয়টি জীবন্ত গুলি।
স্টারমারের এই মন্তব্যের পরই বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজরে আসে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পেতের মাজার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ন্যাটো সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের একটি অস্বাভাবিক উপহার— আমার নাম খোদাই করা একটি ম্যাগনাম রিভলভার, সঙ্গে গোলাবারুদ।’
হাঙ্গেরিয়ান প্রধানমন্ত্রীর এ পোস্টের পর বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় আসে। জানা যায়, বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ভেভার বিমানে ওঠার সময় উপহারের প্রকৃত বিষয়টি জানতেন না। জানতে পেরে বিমানবন্দরেই সেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছেন।
ন্যাটোকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অযৌক্তিক— সম্মেলনের আগে ফের ক্ষোভ ট্রাম্পের
ভেভারের দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, বেলজিয়ামে অবতরণের পর তিনি বুঝতে পারেন যে এটি একটি কার্যকর আগ্নেয়াস্ত্র। এরপর তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেটি বিমানবন্দর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন, যেন নিরাপদ ভল্টে সংরক্ষণ করা যায় এবং দেশের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ডে ভেভারের নিরাপত্তা দলকে একই সঙ্গে ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা— ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তার রিভলভারও নিরাপদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। এতে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক প্রোটোকল সামলাতে তাদের অতিরিক্ত ঝামেলায় পড়তে হয়।
উরসুলা ফন ডার লিয়েনের মুখপাত্র জানান, তিনি উপহারের জন্য এরদোয়ানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে অস্ত্রটি ব্যবহার অযোগ্য (ডিকমিশন) করে পরে একটি সামরিক জাদুঘরে দান করা হবে।
পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কির রিভলভারও নিরাপদে দেশে পৌঁছেছে। তবে এ ক্ষেত্রে দেশটির কর্মকর্তারা বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন। কারণ ২০২২ সালের ডিসেম্বরের একটি বিব্রতকর ঘটনা এখনো তাদের স্মৃতিতে তাজা।
ন্যাটো সম্মেলনের আগে ইউক্রেনে রুশ হামলা, নিহত ২০
ওই সময় ইউক্রেন সফর থেকে ফিরে পোল্যান্ডের পুলিশপ্রধান উপহার হিসেবে পাওয়া একটি অ্যান্টি-ট্যাংক গ্রেনেড লঞ্চার নিজের দপ্তরে নিয়ে আসেন। পরে সেটি বিস্ফোরিত হলে তিনি আহত হন এবং ওয়ারশতে পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ওই ঘটনার কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট নাভরোৎস্কির এক সহকারী স্থানীয় একটি রেডিওকে বলেন, এবার নিশ্চিতভাবেই কেউ এটি থেকে গুলি ছুড়তে যাচ্ছে না!
বিভিন্ন দেশের আইন অনুযায়ী সক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র আন্তর্জাতিকভাবে বহন করা অত্যন্ত জটিল। এ কারণে কিয়ের স্টারমার, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস ও নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব ইয়েটেনসহ কয়েকজন নেতার রিভলভার আপাতত তুরস্কেই রয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেগুলো পাঠানো হবে।
এদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজের রিভলভার সঙ্গে নিয়ে গেলেও জীবন্ত গুলিগুলো তুরস্কেই রেখে গেছেন। কানাডার কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করলেও কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
অন্যদিকে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসনের দপ্তর জানিয়েছে, অস্ত্রটি সুইডেনে নেওয়া হবে, তবে দেশের সব আইন ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তবেই।
ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে রাখার আশা হারাচ্ছে ইউরোপীয় মিত্ররা
কূটনৈতিক অঙ্গনে বড় প্রশ্ন— কেন রিভলভার?
তুর্কি প্রেসিডেন্টের এমন চমক জাগানিয়া উপহার বিস্ময় ছড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা ইস্যুকেও সামনে নিয়ে এসেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— কেন এমন উপহার?
ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল বারবার একই প্রশ্ন তুলেছে। রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে উপহার বিনিময় আন্তর্জাতিক কূটনীতির দীর্ঘদিনের রীতি হলেও সাধারণত সেই উপহার পরিবহনে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা আইনগত ছাড়ের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু এবার একটি সম্পূর্ণ সক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ও তাজা গুলি উপহার দেওয়ায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়।
আঙ্কারার এ সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক ছিল আলোচনার মূল বিষয়। তবে সম্মেলন শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে ওঠে এরদোয়ানের এই ব্যতিক্রমী উপহার।
এ বিষয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের কাছে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তারা কোনো মন্তব্য করেনি।


















