প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভারত সফর থেকে একেবারে শূন্য হাতে এসেছি, সেটি বলা যাবে না। ভারত সফরের অভিজ্ঞতা জানাতে বুধবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভারত সফর থেকে কী পেল বাংলাদেশ? একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কী পেলাম, এই প্রশ্নটা খুব আপেক্ষিক। এটা আপনার নিজের ওপর নির্ভর করছে, আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে গত সপ্তাহে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর মধ্যে কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টনও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনার নিজের ওপর নির্ভর করছে, সফরটিকে কীভাবে দেখছেন। ভাগ্যিস আপনি প্রশ্ন করেননি, আমরা ভারতকে কী দিলাম। আমার কথা হচ্ছে, এই সফর থেকে যা যা পেয়েছি, তা বলেছি। মনে রাখতে হবে, ভৌগোলিকভাবে আমাদের চারদিকে ভারত। একদিকে মিয়ানমার। সেই বন্ধুপ্রতিম দেশটি থেকে ব্যবসা, বাণিজ্য, কৃষি যোগাযোগসহ সব বিষয়ে সহযোগিতা পাচ্ছি। আমরা ভারত থেকে পাইপলাইনে করে তেল নিয়ে এসেছি। আমরা যা পণ্য উৎপাদন করি, তারপরও তাদের কাছ থেকে পণ্য আমদানি করতে হয় আমাদের। এবারের সফরে এলএনজি আমদানির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা খুলনার ওই অঞ্চলের জন্য এলএনজি আনতে পারি। ওই দিকে গ্যাসের সমস্যা আছে। এভাবে হিসাব করেন, একেবারেই শূন্য হাতে এসেছে, সেটা বলতে পারবেন না। তবে কী পেলাম বা না পেলাম, তা মনের ব্যাপার। মন যদি বলে কিছুই পাইনি, তবে আমার কিছু বলার নেই। যেমন বাংলাদেশে আমরা এত কাজ করার পরও বিএনপি বলে কিছুই করি নাই। এখানে আমার কিছুই বলার থাকে না। এখানে বিশ্বাসের ব্যাপার। আত্মবিশ্বাসের ব্যাপার।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের যে ভৌগলিক অবস্থা, চারিদিকে ভারত, একটুখানি মিয়ানমার, তারপর বে অব বেঙ্গল। বন্ধুপ্রতীম দেশ থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, যোগাযোগ সব বিষয়ে সহযোগিতাটা আমরা পাই। নুমালিগড় থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল নিয়ে আসছি। সেই লাইনটা কিন্তু ভারত নির্মাণ করে দিচ্ছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে এই তেলটা থাকবে। উত্তরবঙ্গে আর সুদূর চট্টগ্রাম থেকে বাঘাবাড়ি হয়ে তেল যেতে হবে না। রিফাইন করা তেল ওখান থেকেই আসবে। অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য আরও বাড়বে। উত্তর বঙ্গের মঙ্গা আমরা দূর করেছি। পাশাপাশি ভারত থেকে এলএনজি আমদানির ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে। ভারত যে এলএনজি নিয়ে আসছে সেখান থেকে খুলনা অঞ্চলের জন্য যেন এলএনজি পেতে পারি সেই আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মনে হয় না যে একেবারে শূন্য হাতে ফিরে এসেছি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সবাই ইলেকশনে পার্টিসিপেট করুক সেটাই আমরা চাই। তবে যদি কেউ না করে সেটা যার যার দলের সিদ্ধান্ত। সে জন্য আমরা সংবিধান তো বন্ধ করে রাখতে পারি না। আমরা চাই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে। সংবিধান অনুযায়ী গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকবে।
অর্থপাচারে জড়িত ‘স্বনামধন্য’ অনেকের তথ্যই তার কাছে আছে
সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিদেশে অর্থপাচারে জড়িত ‘স্বনামধন্য’ অনেকের তথ্যই তার কাছে আছে এবং দুদক বিষয়গুলো দেখছে। অনেক স্বনামধন্যদের ব্যাপারেও আমার কাছে আছে। তবে হ্যাঁ, আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন এবং ব্যাংকের ওখান থেকে খবর নেওয়া হচ্ছে। আসবে, সামনে একদিন আসবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই। এটা নজরদারিতে আনা হয়েছে বলেই আপনারা জানতে পারলেন। আপনারা খুঁজে বের করেননিতো। সাংবাদিকরা বের করেনি। আবার এমন এমন অনেকের অর্থ পাচারের তথ্য আছে, ওটা আপনারা লিখবেন কি না আমার সন্দেহ আছে। আমি সোজা কথা বলি। অনেক স্বনামধন্যদের ব্যাপারেও আমার কাছে (তথ্য) আছে। সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা করা বাংলাদেশিদের তথ্যের বিষয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক নিয়েও তিনি কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুইস ব্যাংকে বহু আগেই আমাদের ডিমান্ড পাঠিয়েছিলাম। তালিকা চেয়েছিলাম। কোনো তালিকা আসে নাই। কেউ বলতে পারে নাই। সবাই বলে যায়, হাওয়ায় বলে যায়, কিন্তু সঠিক তথ্য দিয়ে বলতে পারে না। এটা একটা সমস্যা। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল শেষে সেখানকার ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঙ্ক, যা আগের বছরের চেয়ে ৫৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশি মুদ্রায় ওই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদের বাধ্যবাধকতা মেনে এসএনবি প্রতিবছর এই তথ্য প্রকাশ করে, তবে সেখানে গ্রাহকের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
ঢাকায় সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নাথালি শুয়ার সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা করা বাংলাদেশিদের বিষয়ে কোনো তথ্য সরকার তাদের কাছে চায়নি। এসব বিষয়ে (তথ্য পাওয়ার বিষয়ে) কীভাবে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যায়, সে বিষয়ে সরকারকে সব ধরনের তথ্য আমরা দিয়েছি। কিন্তু আলাদাভাবে অর্থ জমা করার বিষয়ে কোনো অনুরোধ আসেনি।
মহামারীর পর ইউক্রেইন যুদ্ধের জেরে ডলারের যে সংকট দেখা দিয়েছে, সে বিষয়ে শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ডলার সংকট বাংলাদেশের একার না। বিশ্বব্যাপী সংকট এখন দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের পরে আমেরিকা যে স্যাংশন দিলো তার পরে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে গেল। এবং সেখানে সংকটটা আরো বেশি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ডলার নিয়ে ‘কিছু খেলা কিছু শ্রেণি খেলতে শুরু করেছিল’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভালোভাবে মনিটরিং করা হয়েছে দেখেই একটা স্থিতিশীল পরিবেশ আমরা আনতে পেরেছি। কিন্তু সংকটটা আন্তর্জাতিক বিষয় থেকে এসেছে। এখানে আমাদের নিজস্ব কতটুকু দায়িত্ব আছে? সামনের দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে এ সংকট আরো ‘বাড়তে পারে’ বলেও আশংকা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমার শংকা হচ্ছে, সারা বিশ্বেই দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। সারা বিশ্বে চরম অর্থনৈতিক দুরাবস্থা দেখা দিতে পারে। আমি কিন্তু আগে থেকে আমাদের সবাইকে বলে রেখেছি, মাটি আছে। ফসল ফলাও। নিজের খাবার নিজে ব্যবস্থা কর। নিজেরটা আগে নিজে করে রাখি। যেন আমাদের কারো মুখাপেক্ষী না হতে হয়। তাওতো বাংলাদেশে আমরা চালাচ্ছি। ইউরোপ, আমেরিকা, ইংল্যান্ডের অবস্থা একবার বিবেচনা করে দেখেন… সেখানে কী ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। সে তুলনায় বাংলাদেশ যথেষ্ট… আমরা প্রণোদনা দিয়েছি। দেশের মানুষের কল্যাণে যা যা করণীয়, সরকার তা করে যাচ্ছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা প্রশ্ন করেন, একই দিনে এক কোটি ২০ লাখ ভ্যাকসিন কেউ দিতে পেরেছে?
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ ছবিটির ট্রেলার নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ফরিদ হোসেন। ছবিটি কবে নাগাদ মুক্তি পেতে পারে প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন ছবিটির এডিটিং চলছে। ট্রেলার দেখার পর অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। একটা বিষয় আপনাদের বলতে পারি, ট্রেলার যদি গ্রহণযোগ্য না হতো, তাহলে ফ্রান্সের কান উৎসব ছবিটি কখনো গ্রহণ করত না। কাজেই এর গুণগত মান নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলতে পারে। কিন্তু বিবেচনা করতে হবে, কান উৎসব যেনতেন কিছু গ্রহণ করে না। মানহীন কিছু দেখাতে দেয় না।
ছবিতে অভিনয় করা শিল্পীদের প্রশংসা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, আমি যেটা বুঝি, আসলে ৭ মার্চে এভাবে জাতির পিতাকে দেখার পর সেটাকে অভিনয় করে দেখালে এটা মেনে নিতে অনেকের একটু কষ্ট হয়। এটাই সমস্যা। সিনেমা যখন হবে, এখানে কাউকে না কাউকে অভিনয় করতেই হবে। আমি তো মনে করি, যেটুকু করেছে, চমৎকার করেছে। ছবির ট্রেলার কান উৎসবে যাওয়ার আগে যেটুকু দেখেছি, ভালো লেগেছে। যেখানে যেখানে সংশোধনের দরকার, তা বলেছি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কান উৎসবে ছবিটি যদি প্রেজেন্টেবল না হতো, তারা এটা দেখাত?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের মনের ভেতরে যিনি (বঙ্গবন্ধু) আছেন, তাঁকে তো ফিরিয়ে আনতে পারব না। এটা যখন সিনেমা, এটাকে সিনেমা হিসেবেই দেখতে হবে। যিনি অভিনয় করেছেন, তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। সেই চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলা কঠিন কাজ। আর সেটা যদি বঙ্গবন্ধুর চরিত্র হয়, সেটা তো আরও কঠিন। আমি বলব, এখানে যারা অভিনয় করেছে, অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। অনেক অভিনেতাও তা পারে না।’ ছবিটির এখন এডিটিং চলছে। একটা ভালো সময় দেখে মুক্তি দেওয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই বায়োপিকের পরিচালক শ্যাম বেনেগাল।
জোটের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের দরজা খোলা
প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে ভোট করার ইঙ্গিত দেন। পাশাপাশি জয়ের প্রয়োজনে দলীয় নমিনেশনে ক্ষেত্রমতো প্রার্থী পরিবর্তনের কথাও জানান। সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জোট-ভোটের বিষয়টি সময় এলে বলা যাবে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা ১৪ দল করেছি। জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করেছি। জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে নির্বাচন করেছে। তবে তাদের সঙ্গে আমাদের একটি সমঝোতা ছিল। ভবিষ্যৎ নির্বাচনে কে কোথায় থাকবে তা সময় বলে দেবে। নির্বাচনে যারা সবসময় আমাদের সঙ্গে ছিল তারা আমাদের সঙ্গে থাকবে। এতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। আর আমাদের সঙ্গে কে থাকবে না থাকবে, বা নতুন জোট হবে বা কী হবে, হোক। অসুবিধা নেই তো। জোট ও ভোটের প্রশ্নে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ উদারভাবে কাজ করে। আওয়ামী লীগের দরজা খোলা।
আগামী নির্বাচনে জনগণ আওয়ামী লীগে ভোট দেবে
আগামী নির্বাচনে জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে দলটির সভাপতি বলেন, সরকারে আসার পর আমরা যে উন্নয়ন করতে পেরেছি, নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, গৃহহীনদের ঘর তৈরি করে দেওয়া, দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা, এভাবে সার্বিক দিক থেকে আমরা উন্নয়ন করেছি। তৃণমূল পর্যায়ে থেকে আমরা উন্নয়ন করে যাচ্ছি। এত কাজ করার পরে অবশ্যই জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে এটা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। তারা যদি এই চলমান উন্নয়নের ধারাটা অব্যাহত রাখতে চান, আর না চাইলে তো কিছু করার নেই। সেটা জনগণের ইচ্ছা।
প্রার্থী পরিবর্তন
জেলা পরিষদে বেশ কিছু প্রার্থী পরিবর্তন হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে এমনটি হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনে নমিনেশনে পরিবর্তন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ক্ষেত্রমতো আমরা অবশ্যই যাচাই করে দেখবো কার জেতার সম্ভাবনা আছে, কার নেই। কে ভোট পাবে না পাবে। আর ভোট পেলে সে জিতবে কিনা সবকিছু বিবেচনা করে নির্বাচনে নমিনেশন দেওয়া হয়। নির্বাচনের এখনও এক বছরের বেশি সময় বাকি আছে। সময় যত যাবে ততই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (ছবি: ফোকাস বাংলা)
জেলা পরিষদে নমিনেশন প্রশ্নে তিনি বলেন, হয়তো বেশি দিন বাঁচবেন না। বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তাদের আর কষ্ট দিতে চাইনি। যাদের নমিনেশন দিয়েছি সেখানে পরিবর্তন আনিনি। এ প্রসঙ্গ তিনি বলেন, দীর্ঘদিন একটানা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে তো, গণতান্ত্রিক ধারাটা অব্যাহত আছে। আপনারা কিন্তু ভুলে গেছেন, ‘৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যার পর বারবার ক্যু হচ্ছিল। একটা মিলিটারি ডিকটেটরের পর আরেকটা মিলিটারি ডিকটেটর। অথবা মিলিটারি ডিকটেটরের স্ত্রী ক্ষমতা নিয়ে গেলো ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে। জনগণের কী ছিল তখন? জনগণের আদৌ কোনও অধিকার ছিল? সারা রাত কারফিউ, কথা বলার অধিকার নেই। কে কখন গায়েব হয়ে যাচ্ছেন তার ঠিক নেই। এই তো ছিল বাংলাদেশের অবস্থাটা। আপনারা এখন টকশো করেন, যে যার মতো কথা বলেন। আওয়ামী লীগ সরকারে আসার আগে কে এত কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন বলেন তো? কেউ পেয়েছে কখনও সুযোগ? পাইনি। একটি টেলিভিশন। একটি রেডিও। কোথায় টকশো আর কোথায় মিষ্টি কথা। সেই তেঁতুলের টকই হোক আর রসগোল্লার মিষ্টি হোক, কোনটাই কেউ তো পাইনি। কথা বলার তো অধিকার ছিল না। হ্যাঁ, এখন শুনি সব কথা বলার পরে বলেন কথা বলার অধিকার নেই। এটাও শুনতে হয়।
যে অন্যায় করবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
বিএনপির আন্দোলনের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আজ রাস্তার আন্দোলন। জনগণ সাড়া না দিলে তো সেটা আমার দায়িত্ব নয়। আওয়ামী লীগ যে বিএনপির হাতে নির্যাতিত সেটা কী ভুলে গেছেন। সবাই তো আওয়ামী লীগের ওপর চড়াও হয়েছে। লাশ টানতে টানতে আর আহতদের চিকিৎসা করাতে আমাদের নাভিশ্বাস উঠেছিল। আজ কি সেই পরিবেশ আছে? তা তো নেই। আমাদের পার্টির কেউ যদি কোনও অন্যায় করে আমরা ছেড়ে দেই না। আমার দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে এজন্য কিছু বলবো না? তা নয়। যে অন্যায় করবে তার বিরুদ্ধে আমি ব্যবস্থা নেবো এবং নিচ্ছি।
মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছি
বিএনপিকে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, যারা তত্ত্বাবধায়ক বা ইত্যাদি বলে চিৎকার করছে তারা ওয়ান ইলেভেনের কথা ভুলে গেছেন? ২০০৭-এর কথা ভুলে গেছেন? কী অবস্থাটি সৃষ্টি হয়েছিল। সেখান থেকে তো অন্তত সবাই মুক্তি পেয়েছেন। ২০০৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার। চলাফেলার অধিকার, সমালোচনার অধিকার। প্রশংসা করার অধিকার সবই তো পাচ্ছেন। কেউ তো কারও মুখ বন্ধ করে রাখছে না। কাউকে তো আমরা বাধা দিচ্ছি না। মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা আমি দিয়েছি। এটা তো স্বীকার করতে হবে। বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, আমি দেশের জন্য কাজ করি। দেশের মানুষের জন্য কাজ করি। আমার স্বার্থ এ দেশের মানুষ ভালো থাকুক। সমালোচনা যারা করবে করুক না। করা তো ভালো। যত পারে কথা বলুক। ভালো কিছু এলে আমরা গ্রহণ করবো। মন্দ কিছু থাকলে পরিহার করবো।
সরকারের উন্নয়নের নানা ফিরিস্তি তুলে ধরে গণমাধ্যমকে তা প্রকাশ উদারতা দেখানোর অনুরোধ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেশি কিপটামি না করে সেগুলো একটু বলেন না ভালো করে। যে কাজটুকু করেছি। আমার বেলায় এত কৃপণতা কেন আপনাদের। টকশোতে টক টক কথা বলেন। টকের সঙ্গে একটু মিষ্টি না হলে আবার টেস্ট হয় না। এটাও মনে রাখবেন। তবে এতে আমার কিছু আসে যায় না। আমি দেশের জন্য কাজ করছি। দেশের মানুষের জন্য কাজ করছি। দেশের মানুষ ভালো আছে কিনা সেই হিসাবটা আমি নিই।
এর আগে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি কোভিড মহামারীর প্রেক্ষিতে দীর্ঘ তিন বছর বিরতির পর আমার এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। সফরের পুরো সময় জুড়ে আমরা ভারতের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ও সৎ প্রতিবেশী হিসেবে সমতা এবং শ্রদ্ধার ভিত্তিতে দুদেশের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার লক্ষ্য করেছি। ভারতীয় নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে, সংবাদ মাধ্যমে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আমি বাংলাদেশের জন্য যে প্রীতি ও সৌহার্দ্য লক্ষ্য করেছি তা সত্যিই অসাধারণ। এই প্রীতির সম্পর্ককে সুসংহত করে আমরা আরও এগিয়ে যেতে চাই।
ভারত সফর থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তির বিষয়গুলোও প্রধানমন্ত্রী তার লিখিত বক্তব্যে তুলে ধরেন।
- কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, যার মাধ্যমে ১৫৩ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
- সীমান্তে প্রাণহানির সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে কাজ করতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।
- ভুটানের সঙ্গে রেল যোগাযোগ ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হবে।
- চিনি, পেঁয়াজ, আদা, রসুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য রপ্তানি বন্ধের আগে বাংলাদেশকে আগাম বার্তা দিতে ভারত সরকার পদক্ষেপ নেবে।
- বাংলাদেশের মুজিবনগর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত ঐতিহাসিক ‘স্বাধীনতা সড়ক’ চালু করা হবে।
- নদী দূষণ এবং অভিন্ন নদ-নদীর ক্ষেত্রে নদীর পরিবেশ এবং নদীর নাব্যতা উন্নয়নের লক্ষ্যে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
- রেলওয়ে সেবার মান বাড়াতে আইটি সল্যুশন বিনিময় করা হবে।
- ২০২২ সালের মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে দুদেশের বাণিজ্য কর্মকর্তাদের কাজ শুরু করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।