রবিবার, ১৯ মে ২০২৪, ০৪:৪৬ পূর্বাহ্ন

জলবায়ু পরিবর্তন: উষ্ণ হচ্ছে বিশ্ব, গলছে হিমবাহ, বাড়ছে অতিবৃষ্টি- সতর্ক বার্তা পাকিস্তানে

মো. আশরাফ আলী / ৫৩ বার
আপডেট : শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২

পাকিস্তানে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা বিশ্বের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকির সতর্কবার্তা হিসাবে দেখছেন বিশেজ্ঞরা। তারা বলছেন, শুধু গরিব দেশগুলোই নয়, এমন রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টি যে কোনো দেশের জন্যই ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।

ভয়াবহ এই বন্যায় পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ চলে গেছে পানির নিচে। শুক্রবার দেশটির আরও ২০০০ হাজার মানুষকে বন্যাকবলিত এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অর্ধেক ফসল ভেসে যাওয়ায় খাদ্য ঘাটতির বিষয়ে সতর্ক করেছেন পাকিস্তানের মন্ত্রীরা।

প্রলয়ঙ্করী এই বন্যার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব খোঁজার চেষ্টা করেছে বিবিসি। সংবাদ সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের পেছনে মানবসৃষ্ট প্রভাব পরিষ্কার। দেশটি এক রকমের অবিচারের শিকার। যেখানে বিশ্ব থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্র ১ শতাংশের জন্য পাকিস্তান দায়ী, যেখানে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফল বেশিই ভোগ করতে হচ্ছে দেশটিকে।

<div class="paragraphs"><p>পাকিস্তানে হায়দরাবাদে বন্যায় তলিয়ে গেছে সড়ক</p></div>

পাকিস্তানে হায়দরাবাদে বন্যায় তলিয়ে গেছে সড়ক ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তানের জলবায়ুমন্ত্রী শেরি রেহমান এই সপ্তাহে বলেছেন, পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ এই মুহূর্তে পানির নিচে রয়েছে। বন্যার পানি দেশের প্রতিটি কোণায় পৌঁছে গেছে। অতীতে যা দেখেছি তার সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তান পৃথিবীর এমন একটি অবস্থানে, যেখানে দুটি প্রধান আবহাওয়ার প্রভাবই ‍দৃশ্যমান। দেশটিতে মার্চে তাপপ্রবাহ খরা নিয়ে আসে। আরেকটি হল মৌসুমী বৃষ্টি।

পাকিস্তানের জনসংখ্যার অধিকাংশেরই বাস সিন্ধু নদীর তীরে। ফলে বর্ষার সময়ে বৃষ্টিতে নদী ফুলে ওঠে এবং বন্যা ডেকে আনে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তীব্র বর্ষার সংযোগ খুব সাধারণ। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বায়ু ও সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়িয়ে আরও বাষ্পীভব্ন ঘটায়। আর উষ্ণ বায়ু আরও আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে, যা বর্ষা মৌসুমের সাধারণ বৃষ্টিপাতের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টি নিয়ে আসে।

বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ভারতীয় গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে গড় বৃষ্টিপাত বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই যে তা ঘটবে, তা ব্যাখ্যা করেছেন পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের আনজা কাটজেনবার্গার। কিন্তু পাকিস্তানের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও শোচনীয়, কারণ এর বিশাল হিমবাহ রয়েছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলকে কখনও কখনও ‘তৃতীয় মেরু’ বলা হয়। এর কারণ মেরু অঞ্চলের বাইরে বিশ্বের যে কোনো স্থানের চেয়ে বেশি হিমবাহ রয়েছে সেখানে।

পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহের বরফ গলে যাচ্ছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বিবিসিকে জানিয়েছে, পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলে ৩ হাজারের বেশি হ্রদ তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৩টি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করেছে, যেগুলো লাখ লাখ ঘনমিটার জল এবং ময়লা-আবর্জনা উগড়ে দিয়ে ৭০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

<div class="paragraphs"><p>গোটা পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে</p></div>

গোটা পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তান সরকার ও জাতিসংঘ আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো স্থাপন করে এই আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। অতীতের বন্যার দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং নিম্নমানের আবাসনের কারণে দরিদ্র দেশগুলো চরম বৃষ্টিপাত মোকাবেলায় কম সক্ষম হয়েছে।

তবে জলবায়ু বিজ্ঞানী ফাহাদ সাঈদ বিবিসিকে বলেছেন, এই গ্রীষ্মে বিপর্যয়কর বন্যায় এমনকি একটি ধনী দেশও তলিয়ে যেতে পারে। এটি একটি ভিন্ন ধরনের বিপর্যয়…বন্যার মাত্রা এত বেশি এবং বৃষ্টি এতটাই চরম যে, খুব শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও এর সঙ্গে লড়াই করতে হবে। উদাহরণ হিসাবে জার্মানি ও বেলজিয়ামের বন্যার কথা বলেন বিশেষজ্ঞ ফাহাদ সাঈদ। ২০২১ সালের সেই বন্যা দেশ দুটির কয়েক ডজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।

পাকিস্তানে গত জুন থেকে অগাস্ট পর্যন্ত ৩৯০ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা গত তিন দশকে এই মৌসুমের গড় বৃষ্টির তুলনায় ১৯০ শতাংশ বেশি। ফাহাদ সাঈদ বলেন, পাকিস্তানের আবহাওয়া বিভাগ বন্যা সম্পর্কে আগাম সতর্ক করার বিষরয় দায়িত্বশীল কাজ করেছে। বন্যা মোকাবেলায় দেশের কিছু অবকাঠামো রয়েছে, তবে সেগুলোকে উন্নত করা দরকার। সবচেয়ে কম কার্বন নির্গমনকারী মানুষগুলোই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানান এই বিজ্ঞানী। সামান্য সম্পদ নিয়ে ভুক্তভোগীরা মাটির ঘরে বাস করছে। জলবায়ু পরিবর্তনে কার্যত তাদের কোনো অবদানই নেই।

<div class="paragraphs"><p>গত জুলাইয়ে ভারী বৃষ্টিপাতে তলিয়ে যায় করাচির সড়ক </p></div>

গত জুলাইয়ে ভারী বৃষ্টিপাতে তলিয়ে যায় করাচির সড়ক ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তানের এমন এলাকাগুলোতে বন্যা হয়েছে, যেখানে সাধারণত এই ধরনের বৃষ্টিপাত দেখা যায় না। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের সিঙ্গ ও বেলুচিস্তান, সারা বছরই যা সাধারণত শুষ্ক বা আধা-শুষ্ক অবস্থা থাকে।

বেলুচিস্তানের ১৭ বছর বয়সী জলবায়ুকর্মী ইউসুফ বালুচের ভাষ্য, দেশে ধনী-গরিব বৈষম্য সমস্যাটিকে আরও খারাপ করে তুলছে। শহরে বাসকারী ও বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত লোকেরা বন্যায় সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ রয়েছে। কোম্পানিগুলো এখনও বেলুচিস্তান থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি আহরণ করছে, কিন্তু সেখানকার মানুষ সবে তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে এবং তাদের কোনো খাবার বা আশ্রয়ও নেই। ছয় বছর বয়সে বন্যায় নিজের ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়া দেখতে হয়েছিল ইউসুফকে। তিনি মনে করেন, বেলুচিস্তান অঞ্চলের মানুষকে সহায়তা করতে সরকার ব্যর্থ।

ডা. সাঈদ বলেন, এই বন্যা বিশ্বের সরকারগুলোর জন্য ‘প্রকৃতপক্ষেই সতর্কবার্তা’, যারা জাতিসংঘের ধারাবাহিক জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। পৃথিবী ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ হওয়ায় এসব ঘটছে। এর চেয়ে বেশি উষ্ণতা পাকিস্তানে অনেক মানুষের মৃত্যু ডেকে আনবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

এক ক্লিকে বিভাগের খবর