শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ০৩:০১ পূর্বাহ্ন

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

রিপোর্টার / ১১৯ বার
আপডেট : বুধবার, ২৫ আগস্ট, ২০২১

তালেবানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে তাদের কাছে আমার প্রথম অনুরোধ ছিল যাতে নিরাপদে পাকিস্তানে ফিরতে সহায়তা করে। আফগান-আমেরিকান যুদ্ধের সময় কান্দাহারের স্পিন বোলদাক-চমন সীমান্ত তখনও তালেবান যোদ্ধাদের দখলে। কিন্তু শুধু সীমান্ত নয়, সীমান্তের দুই পারেও যে তাদের অবাধ যাতায়াত, সেটা ছিল আমার কল্পনার বাইরে। স্থানীয় তালেবান কমান্ডার যদি হুডখোলা জিপে পাশের সিটে বসিয়ে সদর রাস্তা ধরে আমাকে দুই দেশের সীমান্ত প্রহরীদের নাকের ডগা দিয়ে বেলুচিস্তানের চমন শহরে না নিয়ে আসতো, হয়তো জানতেও পারতাম না ২০০১ সালের ওই যুদ্ধে পাকিস্তানের দ্বিমুখী ভূমিকাটি।

পাকিস্তানের দ্বিচারিতা সম্পর্কে ধারণা না করার কারণ হচ্ছে ‘ওয়ার অন টেরর’-এ ইসলামাবাদ আমেরিকার প্রধান সহযোগী। তালেবান সরকারকে হটানোর জন্য তারা একযোগে কাজ করছে। প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ বারবার বলেছেন যে তালেবান পাকিস্তানে আসার কোনও সুযোগ নেই। সীমান্ত ‘সম্পূর্ণ সিল’ করে দেওয়া হয়েছে, কাক-পক্ষীও আসার সুযোগ নেই। একদিকে তারা তালেবান হটানোর জন্য নিজের মাটি আমেরিকানদের ছেড়ে দিয়েছে, অন্যদিকে সেই তালেবান নেতাদের পাকিস্তানে সেফ হ্যাভেন দেবে- কীভাবে ভাবা যায়! তবে পাকিস্তান সরকার ওই যুদ্ধে আমেরিকার সহযোগী হলেও তালেবানের জন্য পাকিস্তানিদের সহানুভূতি বিদ্যমান থাকার বিষয়টি অস্পষ্ট ছিল না সাংবাদিকদের কাছে।

তালেবানের হাতে বন্দি হয়েছিলাম সেই খবরটি আমি একদিন পর আমার পত্রিকা দৈনিক আজকের কাগজকে দিয়েছিলাম। কিন্তু কী করে ফিরেছিলাম, পাকিস্তানের মাটি যতক্ষণ ত্যাগ করিনি, সে সম্পর্কে মুখ খুলিনি। তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের জটিল সম্পর্কের বিষয়টি তাই ২০ বছর আগে থেকেই জানা আমার।

পাকিস্তান সরকারের ভূমিকা যাই হোক না কেন, তালেবান যুদ্ধে ক্ষমতা হারানোর পরেও আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়তে পাকিস্তান আর্মি এবং আইএসআই যে তাদের অব্যাহত সহায়তা দিয়েছে সেটা এখন গোপন নেই কারও কাছে। এখন তালেবান উত্থানে পাকিস্তান খুশি না বিপাকে আছে, সেটা জানতে হলে তাদের সম্পর্কের জটিল অধ্যায়ও জানা দরকার। ১৮৮৩ সালে ব্রিটিশরা ডুরান্ড লাইন দিয়ে পশতুন জনবসতিকে দুই ভাগ করে ভারত উপমহাদেশ এবং আফগানিস্তানের মধ্যে বিলি করে দিয়েছিল। যেমনটা ১৯৪৭ সালে বাংলাকে ভাগ করে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে দিয়েছিল।

আবার ১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশরা ভারত ভাগ করছিল ওই সময় আফগানিস্তানের শাসক বললো যে পাকিস্তানে যেসব পশতুন রয়েছে তাদের স্বাধীন পশতুনিস্তান সৃষ্টির অধিকার রয়েছে। অবশ্য সেটা সম্ভব হয়নি। কারণ, পাকিস্তান এবং ব্রিটিশ তাতে রাজি ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে আফগান সরকার তখন ডুরান্ড লাইন উপেক্ষা করার চেষ্টা করে এবং তারা দাবি করতে থাকে যে পাকিস্তানের পশতুন বসতি অঞ্চল আসলে আফগানিস্তানের এলাকা। সেই তখন থেকেই আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মধ্যে এই ডুরান্ড লাইন নিয়ে বিরোধ চলছিল এবং ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ যখন পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, আফগানিস্তান একমাত্র রাষ্ট্র যারা এর বিরোধিতা করেছিল।

পাকিস্তানের পশতুন অঞ্চল অপেক্ষাকৃত কম উন্নত এলাকা। সে কারণে ওই এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বেশি এবং ড্রাগ কেনাবেচা, স্মাগলিংসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেশি ঘটছে। পাকিস্তান দাবি করছে যে আফগানিস্তান ওই এলাকায় পশতুনিস্তান সৃষ্টির জন্য ইন্ধন দিচ্ছে। জেনারেল জিয়াউল হক যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন তিনি পশতুন অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ ওহাবি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যাতে পশতুনরা জাতীয়তাবাদ ভুলে ইসলামিক মনোভাবে সমৃদ্ধ হয় এবং ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান নিয়ে চিন্তা করে।

কিন্তু সেটি আসলেই হিতে বিপরীত হয়েছে। এই মাদ্রাসায় পড়ুয়ারাই পরে তালেবানের বড় সমর্থক হিসেবে দেখা দেয় এবং ১৯৯৬ সালে আফগান মুজাহিদিনকে সরিয়ে মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলে সহায়তা করে। মোল্লা ওমরসহ তালেবানের অনেক প্রতিষ্ঠাতা একসময় মুজাহিদিনের অংশ ছিল। ’৭৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়া আফগান দখল করার পর তাদের হটানোর জন্য পাকিস্তান-সৌদি আরব এবং আমেরিকা যৌথভাবে এই মুজাহিদিনদের সহায়তা করেছে। আবার সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধে হেরে আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর মুজাহিদিনরা ক্ষমতা পেয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করে। মোল্লা ওমররা ওই অরাজকতার বিরুদ্ধে লড়ার জন্য তালেবান সৃষ্টি করলে দ্রুত জনসমর্থন পেয়েছিল এবং সফল হয়েছিল।

আগেই বলেছি ২০০১ সালে আল-কায়েদা ধ্বংস এবং তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আমেরিকা যখন আফগানিস্তানে হামলা করে তখন অনেক তালেবান নেতা পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। তাহলে এখন প্রশ্ন আসতে পারে যেহেতু তালেবান বাহিনী বিচ্ছিন্নতাবাদে বিশ্বাসী এবং পাকিস্তানি তালেবানের সঙ্গে নিয়ে পশতুনিস্তান করতে চায়, তাহলে পাকিস্তান ওই সময়ে তাদের আশ্রয় দেওয়ার কী কারণ থাকতে পারে? কেন তারা এতদিন ধরে তালেবানকে সমর্থন দিয়েছিল, এমনকি আজকের দিনেও তালেবানকে সাপোর্ট দিচ্ছে? এর প্রধান কারণ ভারত।

আমেরিকানরা তালেবান হটিয়ে আফগানিস্তানে যে সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে সেই হামিদ কারজাই থেকে আশরাফ গণি, এরা যেমন আমেরিকার পুতুল সরকার ছিল, তেমনি আঞ্চলিক রাজনীতিতে এরা ভারত-ঘেঁষা শাসক ছিলেন। এর আগে সোভিয়েত সমর্থিত আফগান সরকারগুলোও ছিল ভারত প্রভাবিত। যুদ্ধের পর আমি নিজেও কাবুল সফরকালে দেখেছি কীভাবে হামিদ কারজাই সরকার আমলে সরকার সমর্থক নর্দান অ্যালায়েন্সের লোকেরা পাকিস্তানিদের ঘৃণা করতো এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতো। আফগান সরকার ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে ভারতনির্ভর হয়ে পড়েছিল।

তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, যেই পশতুন জাতীয়তাবাদ নিয়ে তাদের ভয়, সেই পশতুন জাতীয়তাবাদ দেশের মধ্যে যেন মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে সেই চেষ্টা করা। পাকিস্তান মনে করে তালেবান সরকারকে সমর্থন করলে পশতুন মুভমেন্ট দাবিয়ে রাখা যাবে। আবার তালেবান সরকারও পশতুনদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করবে না। পাকিস্তানকে চটিয়ে তালেবান সরকার কিছু করবে না। কারণ, তারা জানে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে হলে সবার আগে তাদের দরকার প্রতিবেশী পাকিস্তানের সমর্থন; পাকিস্তান তাদের দুর্দিনের আশ্রয়স্থল।

এমনকি এখনও তালেবানের একটি রাজনৈতিক শাখার নাম কোয়েটা শুরা। এরা পাকিস্তানের কোয়েটাতে আশ্রিত। গত ১৪ জুলাই ২০২১, যেদিন আফগান সরকারি বাহিনীর হাত থেকে তালেবান বাহিনী স্পিন বোলদাক-চমন সীমান্ত দখল করেছিল, কোয়েটায় তালেবান বিজয় মিছিল করেছে।

তালেবান এখন মহিলাদের অধিকারের বিষয়ে যে ছাড় দেওয়ার কথা বলছে, সব পক্ষকে নিয়ে কাবুলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, মিডিয়ার স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলছে– সবই পাকিস্তান এবং আন্তর্জাতিক মহলের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য। এমনকি তারা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথাও শোনাচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক মহল তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন না বলে এবং ২০ বছর আগের সেই তালেবান না ভাবে। ইতোমধ্যে তারা স্বীকৃতির বিষয়ে চীন, রাশিয়া, তুরস্কের কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছে, আর পাকিস্তান তো আছেই।

কিন্তু এত কিছুর পরও পাকিস্তানের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, এই তালেবানি আইডিওলজি পাকিস্তানে যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে দিচ্ছে। ২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পেশোয়ারে এয়ারফোর্স বেস-এ হামলা, ২০১৪ সালের ৯ জুন করাচি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে সন্ত্রাসী হামলা কিংবা ২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর পেশোয়ারের স্কুলে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল– সবকিছুর পেছনে ছিল পাকিস্তানি তালেবান সন্ত্রাসীরা।

তালেবানের আফগান দখলের মাধ্যমে এসব গোষ্ঠী এখন প্রেরণা পাবে, যার অগ্রভাগে রয়েছে টিটিপি বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান। টিটিপি তালেবানের একটি অংশ যারা পাকিস্তানের উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় ছোট ছোট গ্রুপে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং পাকিস্তান আর্মি মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় তাদের ওপর যে হামলা চালিয়েছে তার প্রতিশোধ নিতে চায়। তারা বিভিন্ন সময়ে সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করে আসছে। পাকিস্তান আর্মি তাদের অনেকটা দুর্বল করে ফেলেছিল কিন্তু যেহেতু তারা ‘আল্লাহর আর্মি’ নামে লড়ছে, ধর্মান্ধদের সমর্থনও পাচ্ছে।

পাকিস্তান আর্মির মতে, যারা পাকিস্তানের ওপর হামলা করে তারা খারাপ টেরোরিস্ট আর কাশ্মির প্রশ্নে ভারতের ওপর হামলা করতে পাকিস্তান আর্মিকে সহায়তা করে তারা ভালো টেরোরিস্ট। বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আর্মির জন্য ‘গুড টেরোরিস্ট’ আর ‘ব্যাড টেরোরিস্টের’ মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হবে।

শুধু তা-ই নয়, তালেবান উত্থানে পাকিস্তানের ইসলামি দলগুলোর মনোবল, বেপরোয়া আচরণও বেড়ে যাবে– যেমন রয়েছে তেহরিক-ই-লাব্বায়েক পাকিস্তান বা টিএলপি। মাওলানা খাদিম হোসেনের নেতৃত্বাধীন এই দল এপ্রিল ২০২১ পুরো পাকিস্তানজুড়ে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল ফ্রান্সে মহানবী (সা.)-এর কার্টুনকে কেন্দ্র করে, যার ঢেউ বাংলাদেশেও লেগেছিল এবং প্রায় ৪০ হাজার মুসল্লি রাজপথে নেমে এসেছিল।

ফলে সার্বিকভাবে বলা যায়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তালেবানের আফগান দখল নিয়ে তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ‘আফগানরা গোলামির জিঞ্জির ভেঙেছে’ বললেও তার দেশের জন্য তালেবান কম বিপদ ডেকে আনবে না। এরমধ্যে পাকিস্তানের মাটিতে তার মিত্র চীনের অনেক উন্নয়নমূলক প্রজেক্টে সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে, চীনা কর্মী মারা যাচ্ছে। এ অবস্থা যদি চলতেই থাকে, পাকিস্তানের পক্ষে চীনকে বোঝানো কঠিন হবে যে তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ পাকিস্তানের মাটিতে নিরাপদ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

এক ক্লিকে বিভাগের খবর