সেটা বুঝিয়ে দিলেন আলাপে উপস্থিত মোবারক হোসেন। পেশায় এই গাড়িচালক ওই এলাকার বাসিন্দা নন। কোনো একটা কাজে এসেছিলেন সেখানে। তার বাড়ি কুমিল্লা শহরের উপকণ্ঠে আলেখার চরে। থাকেন টমছমব্রিজ এলাকায়। ভোট দিয়েছেন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গোবিন্দপুর স্কুল কেন্দ্রে। আর ইব্রাহিমের বাড়ি কুমিল্লার বরুরা এলাকায়। তিনিও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের অশোকতলার বাসিন্দা ৩০ বছর ধরে। ভোট দিয়েছেন অশোকতলা স্কুলে। তবে ইব্রাহিমের সঙ্গে মোবারকের সখ্য পুরোনো। মোবারক বুঝিয়ে বললেন, “ইব্রাহিম ধানের শীষের কথা বলছেন। ধানের শীষ ভেবেই ভোট দিয়েছেন কায়সারের ঘোড়া প্রতীকে।
ভোটের রাজনীতিতে নবাগত নিজাম উদ্দিন কায়সারের এটাই সাফল্য। নির্বাচন করতে গিয়ে দল থেকে চিরতরে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও নিজের প্রতীক ঘোড়াকে বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের একটা বড় অংশের কাছে ধানের শীষের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছেন। সেই কায়সারের পাওয়া ভোটই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে এবারের নির্বাচনে বলে মনে করছেন অনেকেই।
কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের সকালে ভিক্টোরিয়া কলেজ কেন্দ্রে নিজের ভোট দিয়ে দুই আঙুলে বিজয় চিহ্ন দেখান স্বতন্ত্র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার।
গবেষক ও কলামিস্ট আহসানুল কবীরও এমনই মনে করছেন। নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাক্কু ওয়ান ম্যান আর্মির মত লড়াই করেছেন এবার। যথেষ্ট কম ব্যবধানে হেরেছেন। তার ভাষ্য, সাক্কুর গলার কাঁটা হয়েছেন কায়সার। কায়সারের ঘোড়া সাক্কুর ঘড়িকে গিলে খেয়েছে।সাক্কুর পক্ষে বিএনপির প্রকাশ্য সমর্থন খুব একটা ছিল না, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খানও তেমনটাই মনে করেন। তিনি বলেন, অপ্রকাশ্য সমর্থন, তা-ও যদি হয় ভিন্ন দলের, তা দিয়ে ভোটের মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।বিএনপি নির্বাচনে না আসায় স্বতন্ত্র প্রার্থী কায়সার অবশ্য শুরু থেকেই তার মত বিএনপি থেকে বহিষ্কার হওয়া সাক্কুর বিরুদ্ধে সোচ্চার।তিনি সভা-সমাবেশ এবং সংবাদমাধ্যমে বারবার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাতের সঙ্গে যে মনিরুল হক সাক্কুর খুব পার্থক্য নেই, সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। দুদিন আগে বলেছিলেন, নৌকা মার্কা বাহার সাহেবের কাছে ‘আপন পোলা’ আর ঘড়ি ‘পালক পোলা’। নৌকা জিতলে উনার শতভাগ জয়। ঘড়ি জিতলে অন্তত ৭০ ভাগ।
কুমিল্লা ৬ (আদর্শ সদর, সিটি করপোরেশন, সেনানিবাস এলাকা) আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার। তার চাওয়াতেই রিফাত এবার ১৩ জনকে পেছনে ফেলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বলে দলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য। কায়সারের মত বাহারও এ নির্বাচনে ব্যবধান গড়তে ভূমিকা রেখেছেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এ তিন জনসহ কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী ছিলেন পাঁচ জন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আগের দুবারে মেয়র সাক্কু এবং আওয়ামী লীগের রিফাতের চেয়ে কায়সারকে অনেক পিছিয়ে রাখছিলেন। তবে ভোটে তৃতীয় প্রধান প্রার্থী হিসেবে তাদের জয় পরাজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন বিএনপির বহিষ্কৃত এ প্রার্থী।

এবারই প্রথম নির্বাচনের মাঠে আসা রিফাত স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসেন। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর প্রতিবাদ করতে গিয়ে একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হন। তখন পালিয়ে বিদেশ চলে যান তিনি।পরে দেশে ফিরে ১৯৮০ সালে কুমিল্লা শহর ছাত্রলীগের সভাপতি হন। ১৯৮১ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে তিনি বহিঃক্রীড়া ও ব্যায়ামাগার সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই বছরে জামায়াত-শিবিরের হাতে হামলার শিকার হন তিনি। তার দুই হাত ও দুই পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়।
১৯৯৬ সালে রিফাত যুবলীগে যোগ দেন। পরে তিনি কুমিল্লা জেলা যুবলীগের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে তিনি কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পান।
সব সময় কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের প্রধান দুই ধারা আফজল-বাহার দ্বন্দ্বেও যুক্ত ছিলেন রিফাত বলে স্থানীয়রা মনে করেন। তিনি বাহারের বিশ্বস্ত অনুসারী বলে পরিচিত। বিএনপি করলেও বাহারের সঙ্গে সাক্কুর সুসম্পর্ক সুবিদিত। সাক্কু ২০০৫ সালে প্রথমবার কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান হন। ২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ছিলেন পৌরসভার মেয়র।
এরপর কুমিল্লা পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলে তিনি দুই দুবার মেয়রের চেয়ারে বসেছেন। এবার মাত্র ৩৪৩ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে। নৌকার রিফাত পেয়েছেন ৫০ হাজার ৩১০ ভোট। হাত ঘড়ি নিয়ে সাক্কু ৪৯ হাজার ৯৬৭ ভোট।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কায়সারের ২৯ হাজার ৯৯ ভোটই সাক্কুর ভরাডুবি নিশ্চিত করেছে। কেননা তিন জনের পাওয়া মোট ভোটের মধ্যে কায়সার ভোট টেনেছেন ২২ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
সাক্কু সব সময় বিএনপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেননি। কখনও বিএনপির প্রত্যক্ষ এবং কখনও আবার পরোক্ষ সমর্থন পেয়েছেন। তবে এবার নির্বাচন করতে নেমে দল থেকে চিরতরে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এর আগে ২০১৭ সালে সাক্কু নির্বাচন করেছিলেন বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে। ওই বছর আফজল খানের মেয়ে, বর্তমানে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমা ছিলেন আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থী। সাক্কু পেয়েছিলেন ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট; সীমার ভোট ছিল ৫৭ হাজার ৮৬৩।
কুমিল্লা সিটির প্রথম নির্বাচনে ২০১২ সালে সাক্কুর সঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে পরাজিত হয়েছিলেন স্বয়ং আফজল খান। ওই নির্বাচনে সাক্কু দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। সেবার হাঁস প্রতীকে সাক্কু ৬৫ হাজার ৫৭৭ ভোট পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত আফজল খান আনারস প্রতীকে নির্বাচন করে পেয়েছিলেন ৩৬ হাজার ৪৭১ ভোট।
২০১২ সালে সংগৃহীত ভোট ছিল ৭০ শতাংশ। ২০১৭ সালে ৬০ শতাংশ। এবার ভোট পড়েছে ৫৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর মধ্যে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ পাওয়া ৪২ বছর বয়সী কায়সার কিছুদিন আগেও ছিলেন কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এবং একই সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক।
কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার বুধবার সিটি নির্বাচনের ভোট দিতে এসে ভিক্টোরিয়া কলেজ কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন।
বিএনপির রাজনীতির উপদলীয় কোন্দলের প্রকাশ ঘটেছে কায়সারের ভোট করার মধ্য দিয়ে- এমনটাই মনে করেন নাগরিক সমাজের নেতা আলী আকবর মাসুম।সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লা জেলা শাখার এই সাবেক সভাপতি বলেন, বিএনপি দলীয় ভোটের একটা অংশ কায়সারের মার্কায় পড়লেও সাক্কু আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অংশের ভোট পেয়েছেন। ভোটের মাঠের তথ্যেও আওয়ামী লীগের এ চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডে রিফাত ভোট পেয়েছেন এক হাজার ৮৮, সাক্কু এক হাজার ৬৮৪ ভোট ও কায়সার ৭২৭। এ ওয়ার্ডের গোবিন্দপুর ও অশোকতলা সবসময়ই আফজল খান পরিবারের দুর্গ বলে পরিচিত। এখানে আফজল গ্রুপের আবদুর রহমান কাউন্সিলর পদে দুই হাজার ২৭০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। বাহারের সমর্থন পাওয়া কাউন্সিলর শাহ আলম খান পেয়েছেন রহমানের অর্ধেকের মত ভোট এক হাজার ১৬৩।
শেষ পর্যন্ত সামান্য ব্যবধানে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সিটি করপোরেশনে দেড় দশকের সাক্কু যুগের অবসান হতে যাচ্ছে। তবে তিনি তা মানতে নারাজ। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ফলাফল প্রত্যাখান করে বলেছেন, প্রয়োজনে আইন-আদালতের আশ্রয় নেবেন তিনি।
বিজয়ে সন্তুষ্ট আওয়ামী লীগ প্রার্থী রিফাত এবং তার অনুসারীরা। নৌকা প্রতীকের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকউল্লাহ খোকন বলেন, আমরা আরও বড় ব্যবধানের বিজয় আশা করেছিলাম। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থীরা যদি দ্বন্দ্ব-সংঘাতে না জড়াত আমরা আরও অনেক বেশি ভোট পেতে পারতাম।-বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম