ফেসবুকে জেরবার সাদিয়া, কী ঘটেছিল?

দুদিন ধরে সোশ্যাল হ্যান্ডেলে সমালোচিত হচ্ছেন উঠতি অভিনেত্রী সাদিয়া। তারও দুদিন আগে একটি রিলসের সূত্র ধরে হয়েছেন ভাইরাল। তবে সূত্রপাত একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের পক্ষ থেকে হলেও শেষটা হচ্ছে পুরো ইন্ডাস্ট্রির তরফে। কেউ পক্ষে কেউ বিপক্ষে।
জেনে নেওয়া যাক সাংবাদিক শফিক আল মামুনের প্রতি সাদিয়া আয়মানের অভিযোগ। ২৬ সেপ্টেম্বর বেলা ১২টার খানিক পরে অভিনেত্রী তার ফেসবুক পোস্টে জানান, দেশের স্বনামধন্য সংবাদপত্র প্রথম আলো আমাদের প্রত্যেকটি আর্টিস্টের জন্য বিশ্বাসের জায়গা, ভরসার জায়গা। প্রথম আলোর ফ্লোরে আমরা সবাই সেফ বলে মনে করি। সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকে প্রথম আলো। সেই প্রথম আলোর একটি ইন্টারভিউতে গিয়ে আমি আজ সোশ্যালি ট্রলড এবং বুলির শিকার হচ্ছি। তার কারণ, প্রথম আলোর এক কর্মী শফিক আল মামুন আমার ইন্টারভিউ দেয়ার সময় গোপনে আমার ভিডিও করেছে, যেখানে আমি মাইক্রোফোন ঠিক করছিলাম। ইন্টারভিউতে রেকর্ড করা প্রফেশনাল ভিডিওর বাইরে একজন আর্টিস্টের পারমিশন ছাড়া গোপনে ভিডিও করে সেই ভিডিও ‘সজ্ঞানে’ এডিট করে শফিক আল মামুন তার নিজস্ব ফেসবুক পেজে আপলোড করেছে, আমি এই ভিডিও ১ দিন পর দেখার পরে ‘কেন আমার অনুমতি ছাড়া এরকম ভিডিও করলো আর সেটা পাবলিশ করলো’ জিজ্ঞাসা করায় সে নানা অজুহাত দেখায়। এরপর আমি যখন বলি আমি অফিসিয়ালি স্টেপ নিবো তারপর সে ভিডিও ডিলিট করে। ততক্ষণে এই ভিডিও বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। নানান বাজে ক্যাপশন দিয়ে এখন বিভিন্ন পেজ এই ভিডিও নানান ভাবে এডিট করে ছাড়ছে। এমনকি সে আমার অনুমতি ছাড়া গতকাল রাতে আবারও আমার একটা ফটোশুটের ছবি তার পেজে স্টোরি দেয় আগের ভিডিওটি নিয়ে তার অপকর্ম ঢাকার জন্য। প্রথম আলোর ফ্লোরে কাজ করার সময় গোপনে ধারণ করা ভিডিও আপলোড করায় সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাকে যে হয়রানির স্বীকার হতে হচ্ছে, আমার যে ক্ষতি হয়েছে, আমার যে মানহানি হয়েছে এই দায়ভার কে নিবে? একজন আর্টিস্ট প্রথম আলোর ফ্লোরে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছে প্রথম আলোরই এক কর্মীর কারণে, এ বিষয়টি প্রথম আলো কর্তৃপক্ষের কাছে এর সুষ্ঠু বিচারের দাবি রাখছি। আশা করি শিল্পীদের আশা ভরসার প্রতিষ্ঠান প্রথম আলো সঠিক বিচার করবে এবং সবসময়ের মতো শিল্পীদের পাশে থাকবে।
এরপর সাদিয়া সকল সাংবাদিকদের প্রতি বলেন, সাংবাদিক ভাইদের অনুরোধ করবো, অন্যায়ের প্রতিবাদে আপনারাও সোচ্চার হবেন, আপনারাই তো একজন শিল্পীর সম্মান ও তার কাজকে প্রমোট করেন। অনুরোধ, এ বিষয়ে আমাকে কারোর ফোন করার প্রয়োজন নেই, এখন পর্যন্ত এটাই আমার অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট পরবর্তীতে কোনও আপডেট জানানোর প্রয়োজন হলে আমার পেজেই জানাবো। আমি শিল্পী আমার শিল্পকর্ম নিয়েই আমি ব্যস্ত থাকতে চাই। ধন্যবাদ আমার সব দর্শককে যারা অন্যায়ের প্রতিবাদে আমার সবসময় পাশে থেকেছেন।
একই দিন প্রতিবাদের ঠিক এক ঘণ্টার ব্যবধানে সাদিয়া আয়মান তার ফলাফলও জানান নিজের ওয়ালে। তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, শফিক আল মামুনের বিষয়টি প্রথম আলো জানার পর তারা অতি দ্রুত অ্যাকশন নিয়েছে। তাকে প্রথম আলোর সঙ্গে সব ধরনের কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলো থেকে আমাকে অফিসিয়ালি জানানো হয়েছে, আমার স্ট্যাটাস দেওয়ার আগেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। যদিও জেনেছি শফিক আল মামুন প্রথম আলোর স্থায়ী কর্মী ছিলেন না। তিনি বিনোদন বিভাগের পার্টটাইমার বা কন্ট্রিবিউটর ছিলেন।
এরপর প্রথম আলোর এমন সিদ্ধান্তের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অভিনেত্রী বলেন, আরেকটি কথা, শফিক আল মামুন তার পেজে যে তারকাদের ভিডিও/সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন এর সঙ্গে প্রথম আলোর প্রাতিষ্ঠানিক কোনও সম্পর্ক নেই। আমার প্রতিবাদ ছিল একজন কর্মীর অপকর্মের বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়। কাজেই কারও ব্যক্তিগত কর্মের দায়ভার নিয়ে প্রতিষ্ঠানের সম্মান যেন ক্ষুণ্ণ করা না হয়, সেটাও আমার দর্শকদের অনুরোধ করবো। আর এত দ্রুত প্রথম আলো তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিবে সেটাও খুবই ইতিবাচক। এজন্যই প্রথম আলো, প্রথম আলো। এজন্যই প্রথম আলোর প্রতি আমাদের সবার আস্থা।
২৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে সাদিয়ার পক্ষ থেকে এই দুটি পোস্টের বিপরীতে বিস্মিত হয়েছেন অনেক শিল্পী ও সাংবাদিক। অনেকেই বলছেন, এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে না এনে নিজেদের মধ্যেও সমাধান করা যেতো। আবার কেউ কেউ বলছেন, সাংবাদিক এমন অপ্রস্তুত ভিডিও প্রকাশ করে মোটেও ঠিক কাজটি করেননি।
মূলত দুদিন ধরে ঘুরেফিরে এই প্রশ্নগুলোই দানা বেঁধেছে মিডিয়ায়।
মূলত মিষ্টি সাদিয়ার এই একঘণ্টার ফেসবুক অ্যাকটিভিটি দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন মিডিয়াকর্মীরা। বিশেষ করে বিনোদন সাংবাদিক কমিউনিটি এর প্রতিবাদে তুলোধুনো করে চলেছেন সাদিয়াকে। তাতে পক্ষ-বিপক্ষও চলছে।
সাদিয়ার এমন প্রতিবাদে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী সুরকার তানভীর তারেক দীর্ঘ এক প্রতিবাদলিপির মাধ্যমে অভিশাপ দিয়েছেন অভিনেত্রীর এমন কাণ্ডের প্রতি। তার ভাষায়, ‘বিধাতা নিশ্চয়ই স্ব-স্ব মহাজন/জোকার/জয়কারীদের এই অভিশাপগুলো কার্যকরীভাবে বণ্টন করে দেবেন।
এদিকে সাংবাদিক কোনও খোদা না যে তার পা চাটতে হবে- এমন মন্তব্য করে সাদিয়ার পক্ষে দাঁড়িয়ে নির্মাতা এস আর মজুমদার লেখেন, যে ভিডিওটি নিয়ে সাদিয়া আপত্তি করেছেন, সেটা যদি আপনি দেখে থাকেন এবং তারপরও যদি সেই কথিত সাংবাদিক শফিক আল মামুনকে আপনার নিরপরাধ, নিষ্পাপ, ভুক্তভোগী (!!!!????) মনে হয়, তো বুঝতে হবে আপনার মগজে পচন ধরেছে এবং আকারে মানুষের মতন হলেও আপনি আসলে মনুষ্যত্বহীন, পা চাটা একজন তৈলবাজ ছাড়া আর কিছুই না। আপনি যদি আমার ফ্রেন্ড লিস্টে থেকে থাকেন তো নিজ দায়িত্ব বের হয়ে যান। নাটক, ওটিটির সকল শিল্পী ও কলাকুশলীদের বলবো, সবাই এক জোট হোন। নিজের মেরুদণ্ড শক্ত রাখুন/করুন। সাংবাদিক কোনও খোদা না যে তার পা চাটতে হবে।
ফেসবুকে জেরবার সাদিয়া, কী ঘটেছিল?
অন্যদিকে যমুনা টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আহমেদ তাওকীরের প্রশ্ন, নায়িকা অভিযোগ করলেন আর সে অভিযোগ আমলে নিলো সাংবাদিকের অফিস…!’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সুষ্ঠু তদন্ত জরুরি ছিল বলেও মনে করেন তিনি।
এদিকে অভিনেত্রী মুমতাহিনা টয়া সাদিয়া আয়মান ও শফিক আল মামুনকে লক্ষ্য করে লেখেন, এই গুণী শিল্পী প্রায় না বুঝে অনেক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন যার ভুক্তভোগী শফিক আল মামুনসহ আরও অনেকেই। তবে তিনি অনুতপ্ত হয়ে ২ মাস পর আপনাকে সরি বলবেন। আর মামুন ভাই আপনারও কোনও ভিডিও আপলোড করার আগে ভালো করে চেক করা উচিত ছিল। এটা অবশ্যই আপলোড যোগ্য ছিল না। একজন নারী শিল্পী হিসেবে আমাদেরকে অনেক সতর্ক থাকতে হয়। হিডেন মাইক পরতে আমরা একটা নিরাপদ জায়গায় যাই, সেটাকে গ্রিন রুম/মেকআপ রুম বলে। আসে পাশে তা না থাকলে ওয়াশরুম এ যেতে হয়। নায়ক/নায়িকাদের ওপর সারাক্ষণ ক্যামেরা চলতে থাকে, তাই আপনি নিজে যদি সতর্ক না থাকেন তাহলে এর দায়ভার আপনার উপরও পড়ে। আমার মিডিয়া ক্যারিয়ার-এর শুরু থেকে মামুন ভাইসহ আরও অনেক বিনোদন সাংবাদিকদের আমি দেখেছি অনেক শিল্পীদের স্পর্শকাতর খবর ধামাচাপা দিয়ে তাদেরকে বাঁচাতে, বিপদের শিল্পীদের পাশে দাঁড়াতে। আমি মামুন ভাইকে চিনি, তিনি কেমন মানুষ আমি জানি। ঘটনাটি একদমই কাম্য না।
দৈনিক সমকালের বিনোদন সম্পাদক অনিন্দ্য মামুন দীর্ঘ প্রতিবাদলিপিতে লেখেন, অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মানের ভিডিওটা দেখলাম। সেখানে কোনও অশ্লীলতা বা তাকে হেয় করার মতো দৃশ্য দেখিনি।
অভিনেত্রী শ্রাবন্তী পুরো বিষয়টিকে একটা দুর্ঘটনা মনে করে অভিযুক্ত সাংবাদিকের পাশে দাঁড়িয়ে লিখেছেন, তিনি এমন মানুষ নন।
এদিকে অভিনেতা মিশা সওদাগর লিখেছেন, সাংবাদিক এবং শিল্পী একে অপরের পরিপূরক। ছোটখাটো ভুলত্রুটি সংশোধন করে নেওয়াই ভালো বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, সাংবাদিক এবং শিল্পী, একে অপরের পরিপূরক। তাই সকলের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা উচিত। ছোটখাটো ভুলত্রুটি সংশোধন করে নেওয়াই ভালো।
একজন শিল্পীর মন আকাশের মতো হওয়া উচিত বলে মনে করেন, চিত্রনায়ক জিয়াউল রোশান। স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন, এরকম একটা লেইম এবং ছোট ইস্যুতে একজন সম্মানীয় সাংবাদিককে ছোট করার মোটিভ থাকাটা কখনোই একজন শিল্পীর শোভা পায় না।
নির্মাতা অনন্য মামুন বলেন, আলোচনা করে সুন্দর সমাধান করা যেতো। অবশ্য আমরা এখন নায়িকাদের স্ট্যাটাস দেখেই সব সিদ্ধান্ত নেই।’ শেষে অভিযুক্ত সাংবাদিকের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে ‘দরদ’ নির্মাতা বলেন, ‘আপনার সাথে যা হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে বলবো সেটা অন্যায়। আর আমার সাথে যা হয়েছে সেটা ভয়ংকর অন্যায়।
এদিকে বিনোদন সাংবাদিকতায় এই সময়ের অন্যতম জ্যেষ্ঠ তুষার আদিত্য বলেন, অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মানের ভিডিওটা দেখলাম। শরীরে বুম (মাইক্রোফোন) লাগানোর সময় তার স্পর্শকাতর স্থান দেখা যাচ্ছিল। ধরে নিলাম অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ করে অন্যায় করেছে, ভিডিও পাবলিশ করেও ভুল করেছে। এরপরেও কিন্তু এটা সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধান করা যেতো। সাদিয়া আয়মান এটাকে এতো বড় ইস্যু না বানালেই বোধহয় জিনিসটা ভালো হতো।
নায়িকা তমা মির্জা বলেন, কে রাইট কে রং সেটা জাজ করতে চাই না, উচিতও হবে না। কারণ আমার কাছে যেটা ঠিক আপনার কাছে নাও হতে পারে। তবে একই সেক্টরে কাজ করতে গেলে ফ্যামিলির মতো ভুল বোঝাবুঝি মান-অভিমান হয়। কিন্তু সেটা যতক্ষণ নিজেদের মধ্যে, ফ্যামিলির মধ্যে থাকে ভালো। এ ক্ষেত্রেও সেটা হলেই ভালো হতো। শফিক আল মামুন মানুষটাকে অনেক বছর ধরে চিনি, আমি যতটুকু চিনি তিনি আপনার আমার জেনে বুঝে ক্ষতি করবে এমন মানুষ না। বাকিটা সময় বলে দিবে।
বলা দরকার, সাদিয়া আয়মানের এক ঘণ্টায় দুই বিস্ফোরক পোস্টে পুরো মিডিয়ায় আগুন ধরে গেলেও তীরবিদ্ধ সাংবাদিক কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি এখনও।