হাসনাতের স্ট্যাটাসে ‘রিফাইন্ড আ.লীগ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’, সমঝোতার জন্য ‘চাপ’

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে ফের বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে ভারতের পক্ষ থেকে ‘ষড়যন্ত্র’ চলছে বলে অভিযোগ করেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। সেনানিবাস থেকে নেওয়া এ উদ্যোগে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু কিছু রাজনৈতিক দল এই ‘ষড়যন্ত্রে’ সম্মত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের এই মুখ্য সংগঠক বলেছেন, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের অপরাধ স্বীকার করে আওয়ামী লীগেরই কিছু নেতা ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ সামনে নিয়ে আসবেন। দেশের রাজনীতিতে তাদের ফেরানোর জন্য হাসনাতসহ আরও কয়েকজনের ওপর ‘সমঝোতার জন্য চাপ’ দেওয়া হয়েছে। তারা সমঝোতায় রাজি না হয়ে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের প্রতিবাদ করলে বলা হয়েছে, ‘আওয়ামী লীগ মাস্ট কাম ব্যাক’।
বৃহস্পতিবার (২০ মার্চ) দিবাগত রাত ১টা ৪৪ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে হাসনাত এই ‘ষড়যন্ত্রে’র কথা তুলে ধরেন। স্ট্যাটাসে তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ হতেই হবে।
স্ট্যাটাসে হাসনাত লিখেছেন, কিছুদিন আগেই তিনি ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে আসার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এই পরিকল্পনা পুরোপুরি ভারতের। সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরিন শারমিন ও ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।
আ.লীগকে নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা নেই: প্রধান উপদেষ্টা
এই পরিকল্পনা জানিয়ে সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে হাসনাত লিখেছেন, আমিসহ আরও দুজনের কাছে ক্যান্টনমেন্ট থেকে এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয় গত ১১ মার্চ দুপুর আড়াইটায়। আমাদের প্রস্তাব দেওয়া হয়, আসন সমঝতার বিনিময়ে আমরা যেন এই প্রস্তাব মেনে নিই। আমাদের বলা হয়, এরই মধ্যে একাধিক রাজনৈতিক দলকেও এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা শর্তসাপেক্ষে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনে রাজি হয়েছে।
হাসনাত লিখেছেন, ‘একটি বিরোধী দল থাকার চেয়ে একটি দুর্বল আওয়ামী লীগসহ একাধিক বিরোধী দল থাকা নাকি ভালো। ফলশ্রুতিতে আপনি দেখবেন, গত দুই দিন মিডিয়াতে আওয়ামী লীগের পক্ষে একাধিক রাজনীতিবিদ বয়ান দেওয়া শুরু করেছে।’
হাসনাতের স্ট্যাটাসে লেখ হয়েছে, আমাদের আরও বলা হয়— রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ যাদের দিয়ে করা হবে, তারা এপ্রিল-মে থেকে শেখ পরিবারের অপরাধ স্বীকার করবে, হাসিনাকে অস্বীকার করবে এবং তারা বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ করবে— এমন প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হবে।
এই প্রস্তাব দেওয়া হলে তৎক্ষণাৎ এর বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের বিচার নিয়ে কাজ করার দাবি তোলেন বলে জানান হাসনাত। তিনি লিখেছেন, “এর উত্তরে আমাদের বলা হয়, আওয়ামী লীগকে ফিরতে কোনো ধরনের বাধা দিলে দেশে যে সংকট তৈরি হবে, তার দায়ভার আমাদের নিতে হবে এবং ‘আওয়ামী লীগ মাস্ট কাম ব্যাক’।”
তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের বিরোধিতায় অনড় ছিলেন বলে প্রস্তাবদাতাদের জানান হাসনাত। তিনি লিখেছেন, “আলোচনার একপর্যায় বলি, যে দল এখনো ক্ষমা চায় নাই, অপরাধ স্বীকার করে নাই, সেই দলকে আপনারা কীভাবে ক্ষমা করে দিবেন! অপর পক্ষ থেকে রেগে গিয়ে উত্তর আসে, ‘ইউ পিপল নো নাথিং। ইউ ল্যাক উইজডোম অ্যান্ড এক্সপিরিয়েন্স। উই আর ইন দিজ সার্ভিস ফর অ্যাট লিস্ট ফোর্টি ইয়ার্স। (তোমরা কিছুই জানো না। তোমাদের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। আমরা এর মধ্যে রয়েছি অন্তত ৪০ বছর ধরে রয়েছি।) তোমার বয়সের থেকে বেশি। তাছাড়া আওয়ামী লীগ ছাড়া ‘ইনক্লুসিভ’ ইলেকশন হবে না।’”
স্ট্যাটাস অনুযায়ী হাসনাত উত্তরে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ইনক্লুসিভিটি হতে পারে না। আওয়ামী লীগকে ফেরাতে হলে আমাদের লাশের ওপর দিয়ে ফেরাতে হবে। আওয়ামী লীগ ফেরানোর চেষ্টা করা হলে যে সংকট তৈরি হবে, তার দায়ভার আপনাদের নিতে হবে।’
হাসনাত লিখেছেন, ‘পরে মিটিং অসমাপ্ত রেখেই আমাদের চলে আসতে হয়। জুলাই আন্দোলনের সময়ও আমাদের দিয়ে অনেককিছু করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কখনো এজেন্সি, কখনো ক্যান্টনমেন্ট থেকে নানা ধরনের প্রেসক্রিপশন গ্রহণ করতে চাপ দেওয়া হয়েছে। আমরা ওসব চাপে নতি স্বীকার না করে আপনাদের তথা জনগণের ওপরেই আস্থা রেখেছি। আপনাদের সঙ্গে নিয়েই হাসিনার চূড়ান্ত পতন ঘটিয়েছি।’
‘আজও ক্যান্টনমেন্টের চাপকে অস্বীকার করে আমি আবারও আপনাদের ওপরেই ভরসা রাখতে চাই। এ পোস্ট দেওয়ার পর আমার কী হবে, আমি জানি না। নানামুখী প্রেশারে আমাকে হয়তো পড়তে হবে, হয়তো বিপদেও পড়তে হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নাই,’— লিখেছেন হাসনাত।
আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের এই ‘ভারতীয় ষড়যন্ত্র’ মোকাবিলায় রাজপথে সবার সমর্থন কামনা করে হাসনাত লিখেছেন, ‘জুলাইয়ের দিনগুলোতে জনগণের স্রোতে ক্যান্টনমেন্ট আর এজেন্সির সব প্রেসক্রিপশন আমরা উড়িয়ে দিয়েছিলাম। আজ আবারও যদি আপনাদের সমর্থন পাই, রাজপথে আপনাদের পাশে পাই, তবে আবারও এই আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের ভারতীয় ষড়যন্ত্রও আমরা উড়িয়ে দিতে পারব।’
জাতীয় ঐকমত্য সভায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রস্তাব
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে হাসনাত বন, ‘আসুন, সব যদি-কিন্তু পাশে রেখে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে পারলে জুলাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমাদের শরীরে এক বিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত আমাদের শহিদদের রক্ত আমরা বৃথা হতে দেবো না। ৫ আগস্টের পরের বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কামব্যাকের আর কোনো সুযোগ নাই। বরং আওয়ামী লীগকে অবশ্যই নিষিদ্ধ হতেই হবে।’
জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে গত ৫ আগস্ট। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, আশ্রয় নেন ভারতে। এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন তিনি।
৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতার নামে জুলাই-আগস্টে হত্যা ও গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে মামলা হয়েছে। শেখ হাসিনার আমলেই প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব অপরাধের বিচারকাজও চলমান।
এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার চিঠি দিয়ে ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরতও চেয়েছে। তবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সাড়া মেলেনি।
হয় আওয়ামী লীগ থাকবে, না হয় আমরা থাকব: হাসনাত
এদিকে জুলাই-আগস্ট হত্যা ও গণহত্যায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশাপাশি দল হিসেবেও আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মহল থেকে রয়েছে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিও। তবে সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচারের বিষয়ে বক্তব্য এলেও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের বিষয়ে নেতিবাচক বার্তাই এসেছে।
সবশেষ বৃহস্পতিবারও হাসনাত আব্দুল্লাহর এই স্ট্যাটাস দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তবে দলটির যেসব নেতার বিরুদ্ধে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বাংলাদেশের আদালতে বিচার করা হবে।