সিনওয়ারের ‘নিরাপদ প্রস্থানের’ বিনিময়ে জিম্মিদের মুক্তি চায় ইসরায়েল

ইসরায়েলি সরকার গাজায় চলমান যুদ্ধের অবসান ও জিম্মি বিনিময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবের শর্তানুযায়ী গাজায় আটক থাকা সব জিম্মিকে এক ধাপে মুক্তি দেওয়া হবে। বিনিময়ে হামাসের শীর্ষ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার, তার পরিবার এবং হামাসের কয়েক হাজার সদস্যকে তৃতীয় একটি দেশে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
জিম্মি মুক্তির বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইসরায়েলের সরকারি কর্মকর্তা গাল হির্শ এই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেছেন। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, হামাস নেতাদের নিরাপদে গাজা ত্যাগ করতে দেওয়া হবে এবং এটিকে আত্মসমর্পণ বা নির্বাসন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে না। প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো যুদ্ধের অবসান ঘটানো, যদিও সিনওয়ার গাজায় তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রভাব হারাবেন না, সংগঠনের নেতৃত্ব বজায় রাখবেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসের নেতারা গাজা ছেড়ে যাওয়ার পর গাজা পুনর্গঠনের জন্য একটি সমঝোতা প্রক্রিয়া শুরু হবে। হামাস বারবার ২ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি বিনিময় চুক্তিতে সম্মতি জানিয়েছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চুক্তি সম্পন্ন করতে বিলম্ব করছেন। হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য খলিল আল-হাইয়া গত মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, নেতানিয়াহুর দায়িত্ব এড়ানোর প্রচেষ্টা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে। নেতানিয়াহু চুক্তি যাতে ভেস্তে যায় সেজন্য ক্রমাগত নতুন শর্ত আরোপ করছেন, যা আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করা এক হামাস কর্মকর্তা তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন যে, নেতানিয়াহু প্রতি বার নতুন শর্ত নিয়ে আসছেন, বিশেষ করে রাফাহ সীমান্ত ও ফিলাডেলফি করিডোর নিয়ে। ফলে বারবার আলোচনা প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বার আমরা শুরুর অবস্থানে ফিরে যাই এবং নতুন আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ইয়াহিয়া সিনওয়ার সম্প্রতি ইয়েমেনের আনসারাল্লাহ আন্দোলনের নেতা আব্দুল-মালিক আল-হুথিকে এক চিঠিতে জানান, হামাস একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার লক্ষ্য হবে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিকে দুর্বল করা।
তিনি উল্লেখ করেছেন, আমরা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে প্রস্তুতি নিচ্ছি যা শত্রুর রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিকে ভেঙে দেবে, যেমনটি আল-আকসা বন্যা (৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা) তাদের সামরিক শক্তিকে ভেঙে দিয়েছে।
ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৪১ হাজার ২৫২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ৯৫ হাজার ৪৯৭ জন আহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি, অন্তত ১১ হাজার এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজদের অধিকাংশ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছেন। ইসরায়েলের দাবি, ৭ অক্টোবর আল-আকসা ফ্লাড অভিযানে ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, অনেক ইসরায়েলি ওই দিন ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এর শিকার হয়েছিলেন।
ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে গাজার উত্তরে চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এই কারণে শিশুদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গাজা উপত্যকার প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই দক্ষিণের রাফাহ শহরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। ১৯৪৮ সালের নাকবার পর থেকে সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এদিকে দক্ষিণ থেকে মধ্য গাজার দিকে কয়েক লক্ষাধিক মানুষ নিরাপত্তার আশায় আশ্রয় খুঁজছেন। যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি বিনিময়ের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সত্ত্বেও ইসরায়েল এখনও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত প্রস্তাব অগ্রাহ্য করছে এবং গাজায় তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। সূত্র: প্যালেস্টাইন ক্রনিকল