শ্রীলঙ্কানদের পরিবর্তনের অপেক্ষা কি শেষ হয়েছে?

দুই বছর আগে, হাজার হাজার শ্রীলঙ্কান তাদের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। সেই ঘটনার পর দেশটি এখন প্রথমবারের মতো নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু অনেকেই বলছেন, তারা এখনও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছেন। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা যখন অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হয়, তখন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সরকারকে পরিবর্তনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। প্রেসিডেন্টকে তারা এই সংকটের জন্য দায়ী মনে করেছিল। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ক্লান্ত ছিল দেশে এই নজিরবিহীন গণআন্দোলন একটি নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। শ্রীলঙ্কানরা তখন একটি বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। আর তা ছিল- দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে উত্তরণের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজন।
রাজাপাকসের দেশত্যাগের কয়েকদিন পর, শ্রীলঙ্কার সংসদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। তবে অনেক বিক্ষোভকারী এটিকে স্থিতাবস্থার জয় হিসেবে দেখেছিলেন। অনেক শ্রীলঙ্কান বলছেন, বর্তমান সরকার মূলত সেই রাজনীতিবিদদের দ্বারা গঠিত, যারা দেশটি দীর্ঘদিন ধরে শাসন করেছে। দেশটির দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ এবং করোনাভাইরাস মহামারির সময় শুরু হওয়া অর্থনৈতিক সংকট পর্যন্ত এই রাজনীতিকরাই দেশের দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৯ সালের দেশটির গৃহযুদ্ধের অবসান হয়।
বিক্ষোভের সময় ৪২ বছর বয়সী চিকিৎসক পথুম কের্নার সাত দিন কারাবন্দি ছিলেন। তিনি বলেন, এই আন্দোলন একটি লক্ষ্য অর্জন করেছিল—একজন নতুন নেতাকে ক্ষমতায় আনা যিনি দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবেন। যদিও অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে খারাপ সময় পেরিয়ে গেছে। তবে কের্নারের মতে, এখনও দীর্ঘ পথ বাকি। কের্নার বলেন, আমরা চেয়েছিলাম একটি নতুন দল, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং উদীয়মান নেতাদের গড়ে তুলতে। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি। তিনি প্রথম দিন থেকেই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন এবং ‘গো হোম, গোটা’ স্লোগানটি চালু করেছিলেন, যা রাজাপাকসে-বিরোধী আন্দোলনের একটি প্রধান স্লোগান হয়ে ওঠে।
বিক্রমাসিংহে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে কিছু অগ্রগতি সাধন করলেও অসন্তোষ এখনও প্রবল। কারণ, তিনি এমন কিছু অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছেন যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। যেমন- কর হ্রাস ও ঋণ পুনর্গঠন কর্মসূচি। একই সময়ে, বিক্ষোভের প্রধান রাজনৈতিক দাবি এখনও পূরণ হয়নি। যেমন—অর্থনৈতিক সংকটের জন্য পূর্ববর্তী সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী অজন্থা পেরেরা বলেছিলেন, তিনি প্রথমে আশা করেছিলেন যে বিক্রমাসিংহে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কাজ করবেন এবং সংকটের সমাধান খুঁজে বের করবেন। কিন্তু এর পরিবর্তে নতুন প্রেসিডেন্ট নাগরিক সমাজের নেতাদের ওপর আক্রমণ করেছেন যারা এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এছাড়া, অর্থের অভাবে স্থানীয় নির্বাচনে বিলম্ব ঘটিয়ে এবং ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশ শাসন করা শক্তিশালী রাজাপাকসের পরিবারকে সুরক্ষা দিয়েছেন। পেরেরা বলেন, তিনি হঠাৎ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু হয়ে উঠলেন। তিনি রাজাপাকসেদের খুশি করার চেষ্টা করছিলেন। অনেক বিক্ষোভকারীর মতো তিনিও চান শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট পদটির ক্ষমতা কমিয়ে আনা হোক এবং সেই ক্ষমতা পার্লামেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর হাতে সেই ক্ষমতা তুলে দেওয়া হোক।
পেরেরা বলেন, প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকা শ্রীলঙ্কার জন্য একটি বোঝা। যেকোনও নতুন প্রেসিডেন্ট এটি ব্যবহার করে দেশের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে নিতে পারে। আমরা এটি আর মেনে নিতে পারি না, আমাদের এটি দরকারও নেই। ওই সময়কার বিক্ষোভকারীরা এখন দেখছেন যে, তারা সবসময় একমত নন দেশ কোন পথে চলবে। ফলে একসময়ের মিত্রদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনে বিক্রমাসিংহের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা হলেন বিরোধী নেতা সাজিথ প্রেমদাসা এবং নতুন বামপন্থি জোটের নেতা পার্লামেন্ট সদস্য অনুরা দিসানায়েক। তারা উভয়েই উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে একটি চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা এবং আরও সুবিধাজনক শর্তের জন্য আলোচনা করা।
মানবাধিকার আইনজীবী স্বাস্তিকা অরুলিঙ্গাম বলেন, সাবেক বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উদীয়মান রাজনৈতিক বিভেদ সুস্থতার গণতন্ত্রের লক্ষণ। বিক্ষোভের সময় বিক্ষোভকারীদের আইনি সহায়তা দেওয়া অরুলিঙ্গাম বলেন, মানুষ এখন আর কেবল জাতিগত সীমারেখা ধরে ভোট দিচ্ছে না, বরং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, এটি ছিল সেই মুহূর্ত, যখন রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভেঙে গিয়েছিল এবং মানুষ রাস্তায় নেমে এসে ব্যবস্থাগত পরিবর্তনের দাবি করেছিল। তাই রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন নিশ্চিতভাবেই ঘটেছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।
অরুলিঙ্গাম ৩৭ বছর বয়সী একজন তামিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য। গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই সম্প্রদার। তিনি নতুন বামপন্থি রাজনৈতিক দল পিপলস স্ট্রাগল অ্যালায়েন্সের এক প্রার্থীর জন্য প্রচারণা চালাচ্ছেন।
অরুলিঙ্গাম স্বীকার করেছেন যে, তার দল এই নির্বাচনে জয়লাভ করবে না। তবে তিনি বলেন, যদি দেশের রাজনীতিবিদরা পরিবর্তনের দাবি পূরণ না করেন, তবে তারা আবারও রাস্তায় নামতে দ্বিধা করবেন না। তিনি বলেন, আমরা রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং আমরা মাঠ প্রস্তুত করছি।