ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া বিশ্বনেতাদের

কথিত লিবারেশন ডেত বিশ্বের সব দেশের পণ্যের জন্য নতুন করে শুল্কহার ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনীতি ও উৎপাদনকে প্রাধান্য নিয়ে এ শুল্ক ঘোষণা করা হলেও তা গোটা বিশ্বে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিশ্বনেতাদের অনেকেই বলেছেন, ট্রাম্পের এই নীতি গোটা বিশ্বের অর্থনীতির জন্যই বড় ধরনের আঘাত হয়ে দাঁড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্র স্থানীয় সময় বুধবার (২ এপ্রিল) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৫ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা সব ধরনের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক ও ৯ এপ্রিল থেকে প্রায় ৬০টি দেশের ওপর আরও বড় ধরনের শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের বক্তব্য, এই পদক্ষেপগুলো অন্যায্য বাণিজ্য নীতির প্রতিশোধ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট ‘দয়া’ দেখিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, এই শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। তার এই পদক্ষেপ আমেরিকাকে আবারও ধনী করে তুলবে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সমালোচনা করে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেইন বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি বড় আঘাত। বৃহস্পতিবার সকালে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমদানির ওপর নতুন শুল্ক আরোপের কারণে অনিশ্চয়তা বাড়বে, বিশ্ব জুড়ে লাখো মানুষের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে।
ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। তবে সবচেয়ে দুর্বল দেশগুলোর ওপর ট্রাম্পের এই শুল্কনীতির প্রভাব কেমন হতে পারে, সে বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ভন ডার লেইন। তার ভাষ্য, এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপরই যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে।
বাংলাদেশ-পাকিস্তানের চেয়ে ভারতীয় পণ্যে কম শুল্ক নেবে যুক্তরাষ্ট্র
ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ইউরোপ ঐক্যবদ্ধভাবে পদক্ষেপ নেবে এবং সতর্ক করে দিয়েছেন যে যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাল্টা ব্যবস্থার প্রস্তুতি নেবে। তিনি বলেন, ‘যদি আপনি আমাদের একজনের বিরুদ্ধে যান, তার মানে আপনি আমাদের সবার বিরুদ্ধে যাচ্ছেন।’
ভন ডার লেইনের মন্তব্য চীনসহ আরও অনেক দেশের সঙ্গেই মিলে গিয়েছে। এসব দেশও ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের কঠোর সমালোচনা করেছে এবং বিরোধিতা করেছে। চীন যেমন জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পালটা দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি ‘ভুল’ হয়েছে। তবে তিনি ‘বাণিজ্য যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে কাজ করবেন।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও জানিয়েছেন বিরূপ প্রতিক্রিয়া। তিনি বলেন, স্পেন একটি উন্মুক্ত বিশ্বের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। আয়ারল্যান্ডের টাওইসেক মিচেল মার্টিন বলেছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ভীষণ দুঃখজনক এবং কারও জন্যই লাভজনক নয়।
ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারের ওপর। প্রতীকী ছবি
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বৃহস্পতিবার এলিসি প্রাসাদে নতুন শুল্ক আরোপের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়িক খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে ফরাসি প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে।
চীনকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘সবচেয়ে খারাপ অপরাধী’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। দেশটির ওপর ২০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করা ছিল, যা এখন ট্রাম্প আরও ৩৪ শতাংশ বাড়িয়েছেন। ফলে চীনা পণ্যের ওপর মোট শুল্ক কমপক্ষে ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অবিলম্বে শুল্ক বাতিল’ করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা আরও জানিয়েছে, চীন ‘নিজস্ব অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা দৃঢ়ভাবে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ৩২ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে তাইওয়ান। তারা ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী চো জং তাই বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘গুরুতর প্রতিবাদ’ জানাবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাড়ানোর প্রতিক্রিয়ায় যা বলছে সরকার
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধ ‘একটি বাস্তবতা’য় পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হান ডাক-সু। তিনি বলেছেন, তার সরকার ‘বাণিজ্য সংকট কাটানো’র উপায় খুঁজে দেখবে। কারণ পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
জাপান বলেছে, তাদের ওপর ২৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার বিষয়টি ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ এবং এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও মার্কিন-জাপান চুক্তিগুলো লঙ্ঘন করতে পারে। অন্যদিকে থাইল্যান্ড বলেছে, তারা তাদের ওপর ৩৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ নিয়ে আলোচনা করবে।
ইসরায়েলের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার আগেই যেখানে ইসরায়েলের অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা আমেরিকা থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর সব শুল্ক বাতিল করেছিলেন, এখন তাদের ওপর ১৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ হওয়ায় তারা ‘সম্পূর্ণভাবে হতবাক’ হয়ে পড়েছেন। দেশটির এক কর্মকর্তা স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি শুল্ক পুরোপুরি বাতিল করার সিদ্ধান্ত এই পদক্ষেপকে প্রতিরোধ করবে।
হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের শুল্ক আরোপ চীনের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপ ছিল। কারণ চীন, মার্কিন পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে। মার্কিন বাণিজ্যে ‘শুল্ক বহির্ভূত’ বাধা আরোপ করেছে। সেইসঙ্গে চীন এমনভাবে কাজ করেছে, যা আমেরিকান অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলোকে দুর্বল করে।
বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসাল যুক্তরাষ্ট্র
যে দেশগুলো সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ বেজলাইন শুল্কের আওতায় পড়েছে, সে সব দেশের নেতারাও ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ যেমন বলেন, এই অন্যায় শুল্ক আরোপের জন্য আমেরিকানদের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে।
তবে তার সরকার কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেবে না বলে উল্লেখ করে আলবেনিজ বলেন, আমরা এমন একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেব না, যার কারণে জিনিষপত্রের দাম বেড়ে যাবে এবং প্রবৃদ্ধি ধীর করে দেবে।
ডাউনিং স্ট্রিটের একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের ওপর কম শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির জন্য দেশটির সরকারের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। দেশটির বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস বলেন, সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহী, যা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ন্যায্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে।
দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল বুধবার কংগ্রেসে একটি আইন অনুমোদন করেছে। অর্থনৈতিক প্রতিদান আইন নামের এই আইনটি ট্রাম্পের আরোপ করা ১০ শতাংশ শুল্কের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
‘লিবারেশন ডে’ নিয়ে আসছেন ট্রাম্প, শঙ্কায় নিম্নমুখী শেয়ারবাজার
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন, তারা যেন প্রতিশোধ না নেয়। তারা যেন মার্কিন সরকারের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘কারণ যদি আপনি প্রতিশোধ নেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনা উসকে দেবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বৃহত্তম বাণিজ্যসঙ্গী কানাডা ও মেক্সিকোর নাম বুধবারের ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়নি। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, তারা পূর্ববর্তী নির্বাহী আদেশ অনুসারে এই দুই দেশের সঙ্গে আচরণ করবে, যেখানে ফেন্টানাইল ও সীমান্ত সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে দুটি দেশের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি বলেছেন, শুল্ক আরোপের কারণে কানাডার ওপর এখনো প্রভাব পড়বে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শুরু হওয়া ২৫ শতাংশ শুল্কের মতো পদক্ষেপ সরাসরি লাখো কানাডিয়ানের উওপর প্রভাব ফেলবে।
কারনি এই শুল্কগুলোর বিরুদ্ধে পালটা পদক্ষেপের মাধ্যমে লড়াই করার করার কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, মার্কিন শুল্ক বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করবে।