বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেছেন, সংঘর্ষ-ভাঙচুরের ঘটনায় অভিযান চালিয়ে আমরা অনেককে গ্রেফতার করেছি। তারা আমাদের অনেক নাম দিয়েছে। যারা জড়িত সকলের নাম আছে। সময় হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। বুধবার (১৭ জুলাই) বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভিসি চত্বরে সাংবাদিকদের সামনে তিনি এসব কথা বলেন। হারুন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেলের স্লিপার খুলতে পারে না, মেট্রো স্টেশন ভাঙচুর করতে পারে না, হাইওয়েও আটকাতে পারে না। বিশেষ একটি মহল তাদের ওপর ভর করে এমন কার্যক্রম চালাচ্ছে। জড়িত সবার নাম আছে, সময় হলে ব্যবস্থা: ডিবি হারুন কোটা আন্দোলনের কর্মসূচি বিএনপি-জামায়াত ঠিক করে দিচ্ছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোটা সংস্কার আন্দোলন সাধারণ ছাত্রদের হাতে নেই ঢাকায় বৃহস্পতিবার মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের ডাক হল ছাড়ছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা ঢাবি ক্যাম্পাসজুড়ে পুলিশ, হলগুলো ফাঁকা সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা আন্দোলনকারীদের হত্যাকাণ্ড ও অনভিপ্রেত ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী আদালতের রায় আসা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

জোট সরকার ও হাওয়া ভবনের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে ভয়াবহ ২১ আগস্ট

রিপোর্টার / ৩০৬ বার
আপডেট : শনিবার, ২১ আগস্ট, ২০২১

আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেক ন্যাক্কারজনক ঘটনা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত উদাহরণ। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা যেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের নতুন সংস্করণ। ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বিদেশে থাকায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা বেঁচে যান। ২১ আগস্টে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতেই এই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। যুদ্ধে যেসব গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়ে সেসব আর্জেস গ্রেনেড দিয়ে হামলা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা এবং আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর ৩রা নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে নৃশংসভাবে কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। এসব বর্বর হত্যাকাণ্ড শুধু ব্যক্তিকেই হত্যা নয়, পাশাপাশি দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করতে পরিচালনা করা হয়েছে। বারবার আওয়ামী লীগ ও এর নেতাকর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা-নির্যাতন করা হয়েছে, বহু নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছেন, কিন্তু আওয়ামী লীগ কখনও দমে যায়নি, উল্টো আরও শক্তিশালী হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। হত্যা ষড়যন্ত্র কোনও আদর্শকে ধ্বংস করতে পারে না। আওয়ামী লীগ তা প্রমাণ করেছে।

১৫ আগস্টের কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ডের ৬ বছর পর আওয়ামী লীগ সভাপতি হয়ে দেশে ফিরেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। সেই থেকে ঘাতক-ষড়যন্ত্রকারীদের বুলেট তাকে তাড়া করে যাচ্ছে। ২১ বার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। শেখ হাসিনা সব সময়ই বলে আসছেন, মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। দেশের প্রয়োজনে বাবার মতো রক্ত দিতে প্রস্তুত আছি। স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক চক্র এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠী সব সময়ই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করতে তৎপর। এমনকি বিএনপি-জামায়াত জোট প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই অপশক্তির সঙ্গে জড়িয়ে দেশে রাজনীতি করে। জামায়াত দেশের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের দল, যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে।

মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং তাদের বংশধররা বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছে। বিএনপি যখনই ক্ষমতায় ছিল নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসন করেছে, বিদেশে চাকরি দেওয়াসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেই দেশব্যাপী আওয়ামী লীগ নিধন শুরু করে। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী নিজামী ও মুজাহিদকে মন্ত্রী বানিয়েছিল। হাওয়া ভবন হয়ে উঠেছিল বিকল্প সরকার। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিরোধী দলের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালাতে থাকে। দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। জঙ্গিবাদের প্রত্যক্ষ মদত দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকার। মানুষকে মেরে গাছে ঝুলিয়ে রেখেছিল জেএমবির শায়খ আব্দুর রহমান, বাংলা ভাই জঙ্গিগোষ্ঠী। যুদ্ধাপরাধী নিজামী তখন মন্ত্রী, জঙ্গিদের পক্ষ নিয়ে মন্তব্য করেছিল, এসব মিডিয়ার সৃষ্টি! অথচ উত্তরাঞ্চলের কয়েকজন মন্ত্রী সরাসরি জঙ্গিদের সহযোগিতা করেছে, সরকারি অফিসে বসে বাংলাভাই ও তার লোকজন মিটিং করেছে। জোট সরকার এসবের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের মদতে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৫৪টি উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গি সংগঠন ও ইসলামি এনজিওর নামে বিদেশি জঙ্গি ও মৌলবাদী সংগঠন সারাদেশে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছিল। সে সময় জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশকে অনিরাপদ রাষ্ট্র ঘোষণাও করা হয়।

সংসদের বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের সন্ত্রাস, বোমা হামলা, জঙ্গি অপতৎপরতার বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করে আসছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শনিবার বিকালে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় দলীয় কার্যালয় ২৩, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সারাদেশে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছিল। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। হাজার হাজার মানুষ সেদিন জড়ো হয়েছিল। সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে যাওয়ার কথা। বুলেটপ্রুফ মার্সিডিজ বেঞ্জ চেপে বিকালে ৫টার একটু আগে সমাবেশস্থলে আসেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে খোলা ট্রাকই ছিল সেদিনের প্রতিবাদ সভার মঞ্চ। ট্রাকে দাঁড়িয়ে সেদিন কেন্দ্রীয় নেতারা প্রায় ২ ঘণ্টার মতো বক্তৃতা দিয়েছেন। পরে ৫টা ২ মিনিটে সভার প্রধান অতিথি, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তৃতা শুরু করেন। বক্তৃতা করেছিলেন প্রায় ২০ মিনিট, সময় তখন বিকাল ৫টা ২২ মিনিট। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তৃতা শেষ করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে এগোতে থাকলেন ট্রাক থেকে নামার সিঁড়ির কাছে। মুহূর্তেই নারকীয় গ্রেনেড হামলা শুরু হয়। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে একের পর এক গ্রেনেড। সে এক ভয়াল অবস্থা!
মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১২টি শক্তিশালী গ্রেনেড। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আইভী রহমানসহ আরও ১১ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সেদিন শুধু গ্রেনেড হামলাই করা হয়নি, নেতাদের মানববর্ম শেখ হাসিনাকে বাঁচালেও তাঁকে বহনকারী গাড়িতেও কয়েক রাউন্ড গুলি করা হয়, গুলিতে নিহত হন তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সহকারী মাহবুব আলম। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যায় শেখ হাসিনাকে বহনকারী বুলেটপ্রুফ গাড়িটি। এই বর্বরোচিত হামলায় প্রাণে রক্ষা পেলেও আহত হন বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। শুধু ২৪ জন মানুষকে হত্যা করাই হয়নি, পাশাপাশি গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হন আওয়ামী লীগের কয়েকশ’ নেতাকর্মী। দলীয় কার্যালয়ের সামনে সভাস্থল ও এর আশপাশে সমগ্র এলাকা রক্তে লাল হয়ে যায়। এলোমেলো হয়ে পড়েছিল লাশ ও চারদিকে ছিল আহতদের আর্তচিৎকার। প্রাণভয়ে মানুষজন দিগ্বিদিক দৌড়াচ্ছিল। গ্রেনেডের বিকট আওয়াজ আর বিস্ফোরণের কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গিয়েছিল আকাশ, প্রাণভয়ে দিকশূন্য হয়ে ছুটেছিল মানুষ। ক্ষণিক সময়েই বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশেই গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। সন্ত্রাস-বোমা হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভায় চালানো হয় পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা।

নারকীয় সে হামলায় নিহত-আহতদের চিকিৎসায় কোনও সহযোগিতা করেনি জোট সরকার। পুলিশ বাহিনী কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়। আহত রক্তাক্ত হাত-পা হারানো মানুষগুলোকে কোনও সাহায্য-সহযোগিতা না করে উল্টো টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করা হয়, যাতে ঘাতকরা সহজে পালিয়ে যেতে পারে। এমনকি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধার করা হলেও আলামত নষ্ট করতে সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ঘটনাস্থলের সব আলামত নষ্ট করে ফেলা হয়। আহতরা যেন চিকিৎসা না পান সেজন্যও উপরের নির্দেশে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (তৎকালীন পিজি হাসপাতাল) সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকদের অলিখিত নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছিল। হামলার পর অগণিত আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে নেওয়া হলেও মূল প্রবেশদ্বার বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত সমর্থক ড্যাবের ডাক্তাররা সেদিন চিকিৎসা দিতে আসেনি। ফলে আহত বেশিরভাগ নেতাকর্মী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিল। জোট সরকারের নির্দেশে নিহতদের লাশের ময়নাতদন্ত ও লাশ হস্তান্তরে নানান টালবাহানা করা হয়।

ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার প্রস্তুতি চলে দীর্ঘ সময় ধরে। কয়েক দফা বৈঠক হয়। বিদেশে থেকে গ্রেনেড আনা, কীভাবে হামলা করা হবে সেই ছক কষা হয়, যেন নিপুণ দক্ষতায় হামলা চালিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এহেন কোনও অপকর্ম নেই যে গ্রেনেড হামলার জন্য করেনি। সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও বিষয়টিতে সায় দিয়েছিলেন, অবহিত ছিলেন এবং তাঁর সরকার খুনিদের বিদেশ পালাতে সহযোগিতাও করেছিল। অথচ সরকারের বক্তব্য ছিল ভিন্ন,  উল্টো আওয়ামী লীগকেই দোষারোপ করছিল তারা। গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতা সমগ্র বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত করেছিল। তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু গ্রেনেড হামলার ঘটনায় সংসদে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি, বিএনপির এমপিরা সরাসরি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে অভিযোগ করে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। খুনিদের মিশন শেষ করার সব ব্যবস্থা করে পরের দিন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেছিলেন, উই আর লুকিং ফর শক্রস্। সরকারের মন্ত্রী এমপিরা এও বলেছিল, শেখ হাসিনাই নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়ে হামলা করেছিল। খালেদা জিয়া নিজে সংসদে বলেছিলেন, ‘উনাকে (শেখ হাসিনাকে) মারবে কে’।
ভয়াল গ্রেনেড হামলার ঘটনায় রাজধানীর মতিঝিল থানায় পৃথক চারটি মামলা করা হয়। ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট রাজধানীর মতিঝিল থানায় এসআই ফারুক আহমেদ, শেখ হাসিনার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব সাবের হোসেন চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আবদুল জলিল বাদী হয়ে পৃথক তিনটি মামলা করেন। ওই বছরের ২০ অক্টোবর একই থানায় আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বাদী হয়ে অপর মামলাটি করেন। মামলাগুলো একত্রে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। কিন্তু হামলার দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয় আওয়ামী লীগের ওপর। এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকেও এই হামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তদন্তের শুরু থেকেই নানা গল্প সাজানো হয়। জোট সরকার বিচারপতি জয়নুল আবেদিনকে নিয়ে এক সদস্যের এক তদন্ত কমিটি করেছিল, এই ‘লোক দেখানো’ তদন্ত কমিটিও কোনও সঠিক প্রতিবেদন দিতে পারেনি; বরং বলেছিল পার্শ্ববর্তী একটি দেশ বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে এই ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। পুলিশের চার জন আইজি পর্যায়ক্রমে শুরু থেকে মামলার তদন্ত কাজে থাকলেও কেউ ঘটনাস্থলে যাননি। সেই সময় পুলিশের পক্ষ থেকে আসামিদের ধরতে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

প্রথমে এক ই-মেইলকে ঘিরে শৈবাল সাহা পার্থ নামের এক যুবককে ধরে এনে গ্রেনেড হামলায় অ্যারেস্ট দেখানো হয়। ভারতে পড়াশোনার কারণে পার্থকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার চর হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। হামলার স্বীকারোক্তির জন্য পার্থকে নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর মগবাজার এলাকা থেকে সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোখলেছুর রহমানকে গ্রেফতার করে আওয়ামী লীগকেই দোষী করার অপচেষ্টা চালানো হয়। সর্বশেষ ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার বীরকোট গ্রামের বাড়ি থেকে জজ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে সিআইডি আটক করে। ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে জজ মিয়ার কাছ থেকে সিআইডি সাজানো জবানবন্দি আদায় করে। কিন্তু পরে প্রকাশ পায় জজ মিয়ার পরিবারকে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন প্রতিমাসে মাসোহারা প্রদানের শর্ত দিয়ে এই সাজানো ভুয়া জবানবন্দি নিয়েছিল। পরে ২০০৭ সালে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। ২০০৮ সালের ১১ জুন আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন সিআইডির সিনিয়র এএসপি ফজলুল করিম। এতে জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, হুজি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।

ওই বছরের ২৯ অক্টোবর একত্রে চার মামলায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে পৃথক দুটি চার্জশিট গঠন করেন আদালত। ১৭ নভেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২০০৯ সালের ৯ জুন ৬১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর ২০০৯ সালের ২৫ জুন অধিকতর তদন্তের আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আদালত ওই বছরের ৩ আগস্ট অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন। ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ দ্বিতীয় দফায় চার্জ গঠন করেন আদালত। ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে জজ মিয়া নাটকের অবসান হয়। ২০১৭ সালের ৩০ মে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। ওই বছরের ১২ জুন আত্মপক্ষ সমর্থন ও ২৩ অক্টোবর যুক্তিতর্ক শুরু হয়।

জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে নেওয়া ১৫টি গ্রেনেড দিয়ে জনসভায় হামলা চালানো হয়। হাওয়া ভবনে তারেক রহমান, যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর নূর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, আবদুস সালামসহ বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতা এবং মুফতি হান্নানসহ শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের বৈঠকে গ্রেনেড হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছিলেন। হাওয়া ভবনেই হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বৈঠকও হয়। পরবর্তীতে মুফতি হান্নানসহ আট জন আসামির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সত্যটা বেরিয়ে আসে। ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও জেএমবির সদস্য শহিদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় আসামির তালিকা থেকে এদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ সাত বছরে সর্বমোট ২২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি শেষে ভয়াল হামলার দীর্ঘ ১৪ বছর পর ১০ অক্টোবর ২০১৮ বুধবার পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় ঘোষণা করেন। নৃশংস এই গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র  প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, ডিজিএফআই’র সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইর তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিমসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং এ মামলার আসামি পুলিশের সাবেক তিন মহাপরিদর্শকসহ ১১ সরকারি কর্মকর্তাকেও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলায় আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে আসে, দণ্ডপ্রাপ্ত রেজ্জাকুল হায়দার ও আবদুর রহিম হামলার আগে বনানীর হাওয়া ভবনে জঙ্গিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এটিএম আমিন, সাইফুল ইসলাম ডিউক ও সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার হামলার পর জঙ্গিদের আশ্রয় ও দেশ ছেড়ে পালাতে সহায়তা করেন। গ্রেনেড হামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ১৮ আসামির মধ্যে ১৫ জন এখনও পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিদের মধ্যে সর্বশেষ গ্রেফতার করা হয় ইকবাল হোসেন ওরফে ইকবাল ওরফে জাহাঙ্গীর ওরফে সেলিমকে। ৩৩ জন রয়েছেন কারাগারে। কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুর রহিম। গ্রেনেড হামলা সংক্রান্ত দুটি মামলা উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। এখন বিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডগুলো অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য হাইকোর্টে বেঞ্চ  নির্ধারণের নির্দেশনা চেয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে নথি উপস্থাপন করা হবে। আমরা সকলেই প্রত্যাশা করি দ্রুততার সাথে যাবতীয় বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে দণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা বা দণ্ড কার্যকর করা হবে।

জাতি প্রত্যাশা করে, যারা পলাতক আসামি তাদের যেকোনও মূল্যে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা হোক। কারণ, ভবিষ্যতে কেউ যেন রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনও রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করার সাহস না পায়। এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার, হাওয়া ভবনে বসে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়, এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া হত্যার পরিকল্পনা বিষয়ে অবগত ছিলেন, যা তৎকালীন বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এই বর্বর হামলায় দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ঘৃণ্য নারকীয় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে প্রমাণ হয়, বিএনপি-জামায়াত তাদের হত্যা-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি অব্যাহত রেখেছিল, জঙ্গিবাদকে উসকে দিয়েছিল এবং সুপরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে হত্যার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়।

এই দেশে তারা আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে দিয়ে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল এবং অশুভ শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

এই হামলা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তদের রায় দ্রুত কার্যকর হলে নিহতদের আত্মা শান্তি পাবে এবং আহতরা যারা দুঃসহ ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে। ভবিষ্যতে এ দেশ থেকে জনগণকে সাথে নিয়ে হত্যা-সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। উগ্রবাদকে নির্মূল করতে হবে। আর যেন কেউ রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে হত্যার রাজনীতি না করে সে ব্যবস্থাও করতে হবে।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

এক ক্লিকে বিভাগের খবর